ইরানে ইসলামী ঐতিহ্যের চার শহর

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ এএম

ইরান হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়। প্রাচীন পারস্যের উত্তরাধিকার বহন করে আজকের ইরান দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য ঐতিহাসিক ভূখণ্ড হিসেবে। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে সীমানা, জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন রাষ্ট্র, পাল্টেছে ভূগোল; কিন্তু ইরানের মাটি এখনো ধারণ করে আছে অতীতের অসংখ্য স্মৃতি।

এই ভূখণ্ডেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, প্রাসাদ ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। জন্ম নিয়েছেন বহু মুসলিম মনীষী, কবি, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী—যাঁদের জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতায় আলোকিত হয়েছে মুসলিম বিশ্ব, এমনকি গোটা মানবসভ্যতা।

ইরানের প্রতিটি প্রাচীন শহর যেন একটি খোলা ইতিহাসের বই। কোথাও নীল টালির মসজিদ, কোথাও শতাব্দীপ্রাচীন সেতু, কোথাও কবি-দার্শনিকের সমাধি—আবার কোথাও আজও বেঁচে আছে প্রাচীন নগরসভ্যতার স্মৃতি।

ইসফাহান: যেখানে ইতিহাস কথা বলে

ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ইসফাহান। জাগ্রোস পর্বতমালার পাদদেশে জায়ান্দে নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৫৯০ মিটার উঁচুতে। এটি ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী।

একসময় ইসফাহান ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ শহর। ১০৫০ থেকে ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে ইসফাহানের সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইসফাহানের সৌন্দর্য যেন ইতিহাসের পাতার কোনো কল্পলোক। অনন্য ইসলামী স্থাপত্য, ছাদঢাকা সেতু, মসজিদের গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার আর কারুকার্যময় স্থাপনা শহরটিকে আজও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র করে রেখেছে। ইরানে একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে—‘ইসফাহান পৃথিবীর অর্ধেক।’ শহরটির সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বোঝাতে এই কথাটিই যেন যথেষ্ট।

প্রাচীনকালে ইসফাহান এলামীয় সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। মেদীয় গোত্রের অধীনে শহরটির নাম ছিল আসপানদানা। ম্যাসেডোনীয় দখল থেকে আর্সাসিডরা ইরানকে মুক্ত করার পর এটি পার্থীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

সাসানিদ যুগে ইসফাহান শাসন করতেন ‘ইসফুরান’ বা সাতটি অভিজাত পরিবারের সদস্যরা। এ সময় শহরটি সামরিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে আরবদের কাছে ইরানিদের পরাজয়ের পর ইসফাহান আরব শাসনের অধীন চলে যায়।

সেলজুক বংশের মালিক শাহের শাসনামলে ইসফাহান আবার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। শুরু হয় শহরটির আরেক স্বর্ণযুগ। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তখন ইসফাহানের গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। বিখ্যাত চিকিৎসক ও দার্শনিক ইবনে সিনা ১১শ শতকে এই শহরে শিক্ষকতা করেছিলেন।

আজও ইসফাহান তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। জায়নামাজ, শতরঞ্জি, গালিচা, বস্ত্র, ইস্পাত ও নানা ধরনের হস্তশিল্পের জন্য শহরটির খ্যাতি রয়েছে। এখানে রয়েছে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের চুল্লি। অনুকূল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে দুই হাজারের বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান।

ইরানের বড় খনিজ তেল শোধনাগার, গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি এবং দেশটির সবচেয়ে উন্নত উড়োজাহাজ তৈরির কারখানাগুলোর একটি ইসফাহানে অবস্থিত। রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও।

তবে আধুনিকতার ভিড়েও ইসফাহানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ইতিহাস। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়—সময়ের দেয়াল ভেদ করে কয়েক শতাব্দী পেছনে ফিরে যাওয়া যায়।

তাবরিজ: ধ্বংসের মধ্যেও যে শহর বারবার জেগে উঠেছে

ইরানের উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত তাবরিজ। প্রশাসনিকভাবে এটি পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী। উর্মিয়া হ্রদের প্রায় ৬০ কিলোমিটার পূর্বে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৩৫০ থেকে ১,৬০০ মিটার উচ্চতায় তিন দিকে পর্বতবেষ্টিত কুরি নদীর উপত্যকায় শহরটির অবস্থান।

তাবরিজের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বেদনাবিধুর। শহরটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। ইতিহাসে বহুবার ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাবরিজ ধ্বংস হয়েছে। ৭৯১, ৮৫৮, ১০৪১, ১৭২১, ১৭৮০ ও ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের ভূমিকম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু প্রতিবারই ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে তাবরিজ।

১৩শ শতকের শেষদিকে মঙ্গোল রাজবংশ ইল-খানের শাসক মাহমুদ গাজান ও তাঁর উত্তরসূরিদের রাজধানীতে পরিণত হয় তাবরিজ। ১৩৯২ সালে তুর্কি দিগ্বিজয়ী তৈমুর লং শহরটি দখল করেন। কয়েক দশক পর কারা কৈউনলু নামের তুর্কমেন জাতির লোকেরা তাবরিজকে তাদের রাজধানী বানায়। তাদের শাসনামলেই নির্মিত হয় বিখ্যাত নীল মসজিদ।

তাবরিজ শুধু ইতিহাসের শহর নয়, এটি উত্তর-পশ্চিম ইরানের বৃহত্তম শিল্প, বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্রগুলোর একটি। গালিচা, বস্ত্র, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পাদুকা, সিমেন্ট, কৃষিযন্ত্র, মোটরযান, খনিজ তেল পরিশোধন, তেলজাত রাসায়নিক দ্রব্য, গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক উপকরণ ও সাবানসহ নানা পণ্য এখানে উৎপাদিত হয়।

শহরটি তার হস্তশিল্পের জন্যও বিখ্যাত। বিশেষ করে হাতে বোনা মাদুর ও গহনার আলাদা খ্যাতি রয়েছে। তাবরিজের মিষ্টান্ন, চকোলেট, শুকনো বাদাম এবং ঐতিহ্যবাহী রান্নাও সারা ইরানে সমাদৃত।

তাবরিজে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের অসংখ্য স্মারক। এর মধ্যে রয়েছে ১৫শ শতকে, ১৪৬৫-১৪৬৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত অপূর্ব নীল টালির মাসজেদ-এ কাবুদ বা নীল মসজিদ। এছাড়া রয়েছে প্রাচীন নগরদুর্গ, যার সরল অথচ বিশাল নকশা এবং সংরক্ষিত ইটের কাজ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

এখানে রয়েছে ইল-খান শাসক মাহমুদ গাজানের ১২ পার্শ্ববিশিষ্ট সমাধি। আধুনিক স্থাপনার মধ্যে তাবরিজ রেলস্টেশন এবং ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তাবরিজ বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য।

২০১৫ সালে বিশ্ব কারুকলা পরিষদ তাবরিজকে বিশ্ব গালিচা বয়ন নগরী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৮ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা—ওআইসি শহরটিকে একটি দৃষ্টান্তমূলক পর্যটন নগরীর মর্যাদা দেয়।

তাবরিজের ইতিহাস যেন একটি বার্তাই দেয়—ধ্বংস যতবারই আসুক, ঐতিহ্য ও মানুষের প্রাণশক্তি থাকলে একটি শহর আবারও জেগে উঠতে পারে।

শিরাজ: কবিতা, মসজিদ আর সুঘ্রাণে মোড়া শহর

ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শিরাজ। এটি ফার্স প্রদেশের রাজধানী এবং ইরানের ষষ্ঠ জনবহুল শহর। শহরটির মোট আয়তন প্রায় ২৪০ বর্গকিলোমিটার।

শিরাজকে অনেক সময় ‘ইরানের এথেন্স’ বলা হয়। এই নামের মধ্যেই যেন শহরটির জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের পরিচয় লুকিয়ে আছে।

শিরাজ মানেই ইতিহাসের সঙ্গে এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক আবহ। শহরের পথে পথে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। রয়েছে করিম খানের নগরদুর্গ, ভাকিল মসজিদ, হাফিজের সমাধি, নাসির-ওল-মোলক মসজিদ বা গোলাপি মসজিদ, ইরাম গার্ডেন, শাহ চেরাঘের মাজার এবং বিখ্যাত কবি সাদি শিরাজির সমাধি।

শিরাজে ইতিহাস শুধু স্থাপনার দেয়ালে বন্দি নয়; কবিতা ও সাহিত্যের মধ্য দিয়েও তা আজও জীবন্ত। হাফিজ ও সাদি—দুই মহান কবির স্মৃতি এই শহরকে মুসলিম বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতির মানচিত্রে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

বিশেষ করে গোলাপি মসজিদের রঙিন কাচ দিয়ে ভোরের আলো যখন মেঝেতে বিচিত্র রঙের ছায়া ফেলে, তখন শিরাজের সৌন্দর্য যেন অন্য এক মাত্রা পায়। আর শাহ চেরাঘের মাজারের আধ্যাত্মিক পরিবেশ শহরটির ধর্মীয় ঐতিহ্যকে আরও গভীর করে তোলে।

শিরাজ তাই শুধু একটি শহর নয়—এ যেন কবিতা, স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক অপূর্ব সম্মিলন।

মাশহাদ: পবিত্রতার আবহে গড়ে ওঠা নগর

ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শহর মাশহাদ। এটি রাজাভি খোরাসান প্রদেশের রাজধানী এবং ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। তেহরান থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার পূর্বে কাশাফ নদীর তীরে অবস্থিত এই শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৮৫ মিটার উঁচুতে।

মাশহাদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় আবেগ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীর সম্পর্ক। শহরটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিত।

মাশহাদে রয়েছে খলিফা হারুনুর রশিদের কবরস্থান। একই সঙ্গে শহরটি বিখ্যাত পারস্য কবি ও ‘শাহনামা’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা ফেরদৌসীর স্মৃতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

শুধু ধর্মীয় গুরুত্ব নয়, অর্থনীতিতেও মাশহাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। রেলপথ, সড়কপথ ও বিমানপথে শহরটি রাজধানী তেহরানের সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে এটি ইরানের অন্যতম বিকাশশীল অঞ্চল। বিশেষ করে উল ও কার্পেট শিল্পের জন্য মাশহাদের খ্যাতি রয়েছে। শহরটিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে।

মাশহাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে ধর্মীয় আবেগ ও নগরজীবন পাশাপাশি প্রবাহিত। একদিকে প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিকতার আবহ, অন্যদিকে শিল্প, শিক্ষা, ব্যবসা ও আধুনিক নগরজীবন—সব মিলিয়ে মাশহাদ যেন ইরানের অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি জীবন্ত সেতু।

ইসফাহান, তাবরিজ, শিরাজ ও মাশহাদ—চারটি শহরের ইতিহাস চার রকম। কিন্তু তাদের একসূত্রে বেঁধেছে সভ্যতা, জ্ঞান, ধর্ম, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির দীর্ঘ উত্তরাধিকার। ইসফাহানের মসজিদের গম্বুজে, তাবরিজের নীল টালিতে, শিরাজের কবিদের স্মৃতিতে আর মাশহাদের পবিত্র স্থাপনাগুলোতে আজও প্রতিধ্বনিত হয় বহু শতাব্দীর ইতিহাস।

 

এমএজেড
আরও পড়ুন