সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৫০:৫০ করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হবে। একই সঙ্গে দলীয় সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ ও নিয়োগ-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়তে পারে। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ভাইভার বাড়তি নম্বরকে ‘নব্য কোটা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি, জালিয়াতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অপব্যবহার ঠেকাতে মানবণ্টনে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা, এর উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করা।
ভাইভায় নম্বর বাড়ছে কেন
প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সমান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এ-সংক্রান্ত বিধিমালা অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সরকারের যুক্তি, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী ও নানা ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে প্রকৃত চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সমস্যা ঠেকাতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাবেক আমলা, জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশ। তাদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষার তুলনায় ভাইভার গুরুত্ব বেড়ে গেলে নিয়োগ বোর্ডের হাতে প্রার্থীর চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও বাড়বে।
১০ নম্বর থেকে ২৫, ৪০ ও ৫০
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের বিভিন্ন পদে মৌখিক পরীক্ষায় সাধারণত ১০ নম্বরের বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে পদ ও গ্রেডভেদে ভাইভার নম্বর ২৫, ৪০ ও ৫০ পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ কোনো কোনো পদের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়তে পারে। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও কোনো প্রার্থী ভাইভায় বেশি নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় এগিয়ে যেতে পারেন।
কীভাবে তৈরি হতে পারে ‘ভাইভা-নির্ভর’ নিয়োগ
ধরা যাক, লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী সর্বনিম্ন পাস নম্বর পেলেন। অন্যদিকে আরেকজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নম্বর পেলেন। আগে লিখিত পরীক্ষার নম্বরের ব্যবধান বেশি থাকায় কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীর পক্ষে ভাইভায় বেশি নম্বর নিয়ে সেই ব্যবধান পুষিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল।
কিন্তু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর যদি সমান হয়, তাহলে ভাইভায় কয়েক নম্বরের ব্যবধানও চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থায় লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীর মেধার পার্থক্য ভাইভায় দেওয়া নম্বর দিয়ে অনেকটাই বদলে দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা প্রার্থীও চূড়ান্ত তালিকায় এগিয়ে যেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের আপত্তি
সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখাই নিয়োগের স্বচ্ছতার জন্য ভালো। তাঁর মতে, লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৮০ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভাইভার নম্বর বাড়ালে নিয়োগে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, এ ধরনের পরিবর্তন প্রশাসনে দলীয়করণ ও দুর্নীতির পথ সুগম করতে পারে। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণির বিভিন্ন কারিগরি পদের আলাদা নিয়োগবিধি থাকায় অভিন্ন মানবণ্টন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকও লিখিত ও ভাইভায় সমান নম্বর রাখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ভাইভায় নম্বর বেশি থাকলে নিয়োগের নিরপেক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা কী
ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া নয়।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি, জালিয়াতি এবং এআই বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অসদুপায় অবলম্বনের প্রবণতা ঠেকানোই নতুন মানবণ্টনের অন্যতম লক্ষ্য।
কারা নিয়োগ দেয় ১১–২০ গ্রেডে
বর্তমানে সরকারি চাকরির ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা নিয়োগের প্রধান দায়িত্ব সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি)। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন দপ্তর-সংস্থার নিজস্ব নিয়োগবিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে।
ফলে নিম্ন গ্রেডের নিয়োগে মন্ত্রণালয় ও অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ বোর্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই পর্যায়ে ভাইভার নম্বর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলে নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রভাবও বেড়ে যাবে।
‘নব্য কোটা’ বলছেন শিক্ষার্থীরা
এই আশঙ্কা থেকেই ভাইভার বাড়তি নম্বরকে ‘নব্য কোটা’ বলছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা ‘বেশি মার্ক ভাইভায়, দলের লোকে চাকরি পায়’, ‘ভাইভার নামে দলীয়করণ, মানি না মানব না’, ‘দিকে দিকে খবর দে, ভাইভা কোটার কবর দে’ এবং ‘নব্য কোটার নাম কী, ভাইভা ছাড়া আর কী?’—এসব স্লোগান দেন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, কোটা পদ্ধতির সঙ্গে ভাইভা নম্বর বৃদ্ধির সরাসরি তুলনা করা না হলেও তারা ‘নব্য কোটা’ শব্দটি ব্যবহার করছেন একটি প্রতীকী অর্থে। তাদের আশঙ্কা, লিখিত পরীক্ষায় মেধার যে প্রতিযোগিতা হয়, ভাইভায় অতিরিক্ত নম্বরের মাধ্যমে সেটিকে অনেকাংশে পাল্টে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে।
ঢাবিতে ডাকসুর নেতৃত্বে মঙ্গলবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল হয়। এতে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর রাখার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মূল বিতর্ক কোথায়
পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে মূলত একটি প্রশ্ন—নিয়োগ পরীক্ষায় মেধা যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় ওজন কি লিখিত পরীক্ষায় থাকবে, নাকি লিখিত ও ভাইভাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে?
সরকার বলছে, প্রক্সি ও জালিয়াতি ঠেকিয়ে যোগ্য জনবল নিয়োগ করাই উদ্দেশ্য। অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রক্সি ঠেকানোর জন্য প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা, কঠোর পরিচয় যাচাই ও উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে; কিন্তু লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার গুরুত্ব বাড়ানো তার কার্যকর সমাধান নয়।
তাদের আশঙ্কা, ভাইভা বোর্ডের মূল্যায়ন যেহেতু লিখিত পরীক্ষার মতো একইভাবে যাচাইযোগ্য নয়, তাই এর নম্বর যত বাড়বে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের প্রভাবের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
গেজেট না হওয়া পর্যন্ত বিতর্ক
এখনও পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। ফলে প্রস্তাবিত মানবণ্টন বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা ও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
তবে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট। বিশেষ করে সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে তারা চান এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা, যেখানে দীর্ঘদিনের পড়াশোনা ও লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাই চূড়ান্ত ফলাফলে প্রধান ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে সরকারের জন্যও চ্যালেঞ্জ হলো—জালিয়াতি ও প্রক্সি বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা এবং নিয়োগের স্বচ্ছতা—দুই দিকের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
কারণ, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ শুধু কয়েকটি পদ পূরণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দক্ষতা, জনগণের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামোর মানও সরাসরি জড়িত। তাই নতুন মানবণ্টন কার্যকর করার আগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ওমান উপসাগরে ইরানি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ভিডিও প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্রের
সাবেক এমপি মনোয়ার হোসেন চৌধুরী আর নেই
ইরানে ইসলামী ঐতিহ্যের চার শহর
মাধ্যমিকের শিক্ষকের জন্য জরুরি নির্দেশনা মাউশির
যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালো অ্যামনেস্টি
জাতিসংঘের নতুন মানচিত্রে ‘অসঙ্গতি’, আপত্তি ভারতের
টাঙ্গাইলে দুর্বৃত্তদের হামলায় আনসার সদস্য নিহত