পদ্মবিলের সৌন্দর্য প্রতিদিন দেখতে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

পদ্ম ফুলের সুবাস নিতে প্রতিদিন জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিলে ভিড় করছেন পদ্ম প্রেমীরা। এ অবস্থায় বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সুরক্ষাসহ পর্যটক বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার দাবী জানিয়েছেন পর্যটকসহ প্রকৃতি প্রেমীরা।লোকাল প্রশাসন জানয়েছে, পদ্ম বিলের সৌন্দর্যের সুরক্ষাসহ বিলের পাশে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ তৈরী করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

বলছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর পদ্ম বিলের কথা।

বিলটি কোথায়, কিভাবে যেতে হয়:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়ক হয়ে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে গিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে যে কাউকে বললে দেখিয়ে দেবে ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্মবিলের পথ। পদ্ম বিলটি ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা। এটি আখাউড়া এবং কসবার মধ্যবর্তী বিশালাকার একটি বিল। স্থানীয়রা পদ্ম বিলটিকে ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্মবিল হিসেবে চিনেন। অপর প্রান্তে কসবা উপজেলার গোসাইস্থল পদ্ম বিল নামেও পরিচিত। বিলটির সীমান্তের পশ্চিমপাড়ে বাংলাদেশের আখাউড়া-কসবা আর পূর্ব প্রান্তে উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা। তবে যাওয়ার পথ যেহেতু আঁকাবাঁকা সেহেতু ছোট যানবাহনে করে যাওয়াই ভাল। বিশেষ করে আখাউড়া কিংবা কসবা উপজেলা থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশা করে গেলেই ভাল।

কখন ফোটে জলপদ্ম:

প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে বিস্তীর্ণ এলাকা জুরে প্রাকৃতিক এই বিলে প্রতি বছর বর্ষাকালে পদ্মফুল ফোঁটা শুরু হয়। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে পদ্মবিল আলোকিত হয়ে উঠে পদ্মরঙ্গে। আর এই পদ্ম ফুলের সুভাষ ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছরই পদ্ম বিলে জরো হয় প্রকৃতি প্রেমিরা।

পর্যটকদের চোখে পদ্ম বিল :

ঢাকা থেকে আখাউড়ায় বেড়াতে আসা পর্যটক জোনায়েদ হোসেন জানান, আমার নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। পরে স্বজনদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, এখানে একটি পদ্মবিল আছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে পদ্মবিলটি দেখার জন্য বের হয়ে আসি। তবে পদ্ম বিলের পারে এসে পদ্মের সুবাস পেয়ে আমি অনেকটাই মুগ্ধ। আসলে এখানে না আসলে প্রকৃতি যে তার নিজস্ব রূপে ডানা মেলেছে, তা মিস করতাম। 


স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ জানান, এই পদ্মবিল কে কেন্দ্র করে, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মফুল প্রেমীরা পদ্মের সুবাস নিতে ছুটে আসেন। প্রকৃতিরই নয়নাবিরাম দৃশ্য অবলোকন করার জন্য। পর্যটকেরা এসে এখানে ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বিলের মাঝ খানে গিয়ে যেন এক অপার্থিব লোকে হারিয়ে যায়। তিনি বলেন, অনেকেই পদ্মের সুবাস নিয়ে ফিরে এসে ড্রেস বদল কিংবা শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। তবে সেই পরিবেশ না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হয়। তবে পদ্ম বিলের পাশে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ তৈরীর জন্য এ গুলো করা জরুরী। আর কোন ক্রমেই প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য যেন বিবর্ণ না হয় সেই দাবী জানিয়েছে পর্যটক সহ স্থানীয়রা।

পদ্মের উৎপত্তি ও স্থায়ীত্বকাল :

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন বলেন, হিন্দু ধর্মীয় পুরান অনুসারে আমাদের হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশ থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে বলে আমরা জানতে পারি। যদি তার বিস্তার সম্পর্কে আমরা বলি, বিভিন্ন ভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে। পদ্মের বীজ পাখির অত্যান্ত প্রিয় খাবার। তাই পাখির মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। প্রাকৃতিক জলধারার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। হিমালয় পর্বতমালা থেকে আমাদের বাংলাদেশের সাতান্নটি নদী বয়ে চলে এসেছে। এর বেশির ভাগই চীন, ভারতের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে চলেগেছে। পদ্মের বীজ অর্থাৎ ফুল থেকে যে ফল হয়, ফলের যে বীজ থাকে এটি আমাদের অঞ্চলের নদ-নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে আমাদের এই ভাটি অঞ্চলের বিল-ঝিলে বীজ পতিত হয়ে বংশ বিস্তার করতে পারে। এ ছাড়া তার যে কাণ্ড, কাণ্ডের নিচে যে কন্দ বা রাইজম বায়োলজিক্যাল ভাষায় আমরা মূল বলতে পারি। এটির লাইফ টাইমটা অনেক বড়। পানি চলে গেলেও, যদিও জলাশয় নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু তার যে কন্দ, এটি মাটির গভীরে অনেক দিন জীবিত থাকে। শুস্ক মৌসুমের পর আবার যখন পানি আসে, তখন এটি আবার জারমিনেট করে আবার নতুন পদ্ম গাছ তৈরি হয় এবং তার মধ্যে ফুল আসে। ​এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে যেমন, মাছের আশ্রয়ের জন্য এটা অনেক উপকারী। মাছ এখানে আশ্রয় নিতে পারে। যদি বিলঝিলে ঝোপ না থাকে, তাহলে মাছগুলো আশ্রয় নিতে পারবে না। ফলে মিঠা পানির মাছগুলো এখান থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

পাখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাবার :

পাখি পদ্মের বীজ খেয়ে জীবন ধারণ করে। পদ্ম বিলুপ্ত হলে পাখির প্রাকৃতিক খাবারও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে পরিবেশের উপর বিরোপ প্রভাব পরবে। পাখির সংখ্যা হ্রাস পাবে। সব মিলিয়ে ইকোসিস্টেম যেটাকে আমরা বলি, এটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে পদ্ম বিলকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত তথ্য: 

বৈজ্ঞানিক ও জীবাশ্ম বা ফসিল রেকর্ড অনুযায়ী প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগেও ক্রিটেসিয়াস যুগে পদ্মের অস্থিত্ব পাওয়া গেছে। প্রতি বছর আষাঢ় মাস থেকে বিলে পদ্মফুল ফোঁটা শুরু হয়। একটানা কার্তিক মাস পর্যন্ত পুরো ৫ মাস পদ্ম ফুলে রঙ্গিন হয়ে থাকে পুরো পদ্ম বিল। তবে হিন্দুদের দুর্গা পূজার উপকরণ পদ্ম তাই পূজোর আগে গেলে পদ্মের দেখা পাওয়া যাবে। পূজোর পরে গেলে ফুলের দেখা নাও পাওয়া যেতে পারে। প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুয়ায়ী বিলটির মোট আয়তন ১২০ একর।

মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক বলেন, এই পদ্মবিলের মধ্যে প্রত্যেক দিন সকালে এবং বিকালে শত শত ছেলে মেয়ে বা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক দর্শনার্থী আসে। তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা সার্বিকভাবে ওখানে একটা কমিটি করে দিয়েছি। বিশেষ করে ওই ওয়ার্ডের মেম্বারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওই এলাকার কিছু সাহেব-সর্দারদেরকেও আমরা দায়িত্ব দিয়েছি, যাতে সুন্দরভাবে এই পর্যটনটাকে যেন সুরক্ষা করা যায়। সেই হিসাবে আমাদের গ্রাম পুলিশ একজন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাতে ফুল মানুষ না ছিঁড়ে। যদি ফুলগুলো না ছিঁড়ে দর্শনার্থীরা, তাহলে দেখা যাবে যে সুন্দর একটা মনোরম পরিবেশ বিরাজ করবে। যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। যারা যাবে প্রত্যেকেই অন্তত মানসিকভাবে একটা শান্তি পাবে।

তিনি আরো বলেন, এখন দর্শনার্থী যারা যায়, তারা যেন সুন্দরভাবে ওখানে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে ফিরে আসতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে যে বহু মেয়ে-ছেলে যায়, এখানে টয়লেট নাই। মানে একটা ভালো টয়লেটের ব্যবস্থা করা উচিত। আমি তার পূর্বে গত বছর যখন আমাদের এডিসি মহোদয় এসেছিলেন, উনাদের কাছে আমি আবদার রেখেছিলাম যেকোনো প্রক্রিয়ায় যেন এখানে একটা সরকারি টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে হয়তো দর্শনার্থীদের আরও সুবিধা হবে।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া বলেন, এখন প্রচুর পদ্ম ফুটেছে, আমি নিজেও গিয়েছি। ওখানে যারা যায় তারা যেন ফুল না ছিড়ে এমন সাইনবোর্ড টানিয়ে ছিলাম, ব্যানার লাগিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। যার কারণে মানুষ সাইনবোর্ড গুলো উঠিয়ে নিয়ে গেছে এবং যে যার মতো করে ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছে। আমরা ওখানে একজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দিয়েছি, যেন সে নিয়মিত থাকে এবং আগত মানুষদেরকে যেন বলে, দয়া করে আপনারা কেউ ফুল ছিড়বেন না। কারণ হাজার মানুষ যদি প্রতিদিন পদ্ম বিলে আসে এবং একটা করে ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যায়, তাহলে দশম দিনে যে আসবে সে আর কোনো ফুলেরই দেখা পাবে না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি যেন, পদ্মবিলকে আরোও সুরক্ষিত রাখা যায়। পাশাপাশি পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সাথেও কথা বলছি। তিনি বলেন, এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এখানে আমরা একটা প্রজেক্ট দিয়েছি যে, ওখানে ভ্রমণ পিপাসু যারা আসেন, তাদের ওয়াশ ব্লক বা তাদের চেঞ্জিং রুম নেই। এগুলো খুব শীঘ্রই কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে টেন্ডার পাস হয়ে গেছে। ওখানে আমরা ভ্রমণপিপাসু লোকদের জন্য ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

এম.সি.এইচ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত