দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু, ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেলো তারা আসলে সহোদর বোন

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

গল্পটি যেন বলিউডের কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। শৈশবে আলাদা পরিবারে দত্তক নেওয়া হয়েছিল দুই শিশুকে। বড় হয়েছেন একই দেশে, কাছাকাছি এলাকায়। কৈশোরে পরিচয় হয় বন্ধুত্বের সূত্রে। এরপর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, চিঠি, আড্ডা, একই রকম পছন্দ—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক গভীর সম্পর্ক। কিন্তু কেউ জানতেন না, এই বন্ধুত্বের আড়ালে রয়েছে আরও গভীর এক রক্তের সম্পর্ক।

ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল সেই রহস্যই সামনে এনেছে। ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া দুই নারী মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেন জানতে পেরেছেন, তারা আসলে জৈবিক বোন।

দুজনের বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়। আশির দশকের শুরুর দিকে কয়েক মাসের ব্যবধানে মুম্বাইয়ের দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে তাদের দত্তক নেয় দুটি ভিন্ন ডাচ পরিবার। পরে তারা নেদারল্যান্ডসে বড় হন।

কৈশোরে প্রথম দেখা

কৈশোরের শুরুতে একটি দত্তক গ্রহণকারী সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় মীনা ও মিনালের। প্রথম দেখাতেই তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক মিল চোখে পড়ে।

মীনা, এখন ৪৩ বছর বয়সী, সেই দিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে করতে পারেন। দত্তক নেওয়া সব শিশুকে একসঙ্গে সময় কাটানো, পরিচিত হওয়া এবং রাতের খাবারের জন্য সেখানে আনা হয়েছিল।

Two friends

সঙ্গে থাকা বন্ধুরাই প্রথম তাদের শারীরিক মিলের বিষয়টি তুলে ধরেন। মীনা জানান, বন্ধুরা তাদের আয়নায় নিজেদের দেখতে বলেন। তখন তিনি লক্ষ্য করেন, দুজনের নাকের গড়ন একই রকম এবং হাসির ধরনও প্রায় এক।

সেদিনের রাতের খাবারে মীনা বারবার মিনালের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পরদিন দুজন নিজেদের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন। রক্তের সম্পর্কের কোনো প্রমাণ না থাকলেও তাদের বন্ধুত্ব যেন প্রথম দেখাতেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

বোনের মতো বন্ধুত্ব

বছরের পর বছর তারা চিঠি লিখেছেন। একে অপরকে প্রায়ই ‘সিস’ বা বোন বলে সম্বোধন করতেন। কারণ, তাদের নিজেদের কাছেই সম্পর্কটি ছিল অনেকটা বোনের মতো। চিঠিতে থাকত স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা, পছন্দের ছেলে, বাইরে ঘুরতে যাওয়া, নাচ, খেলাধুলা ও গান। এমনকি তাদের সংগীতের পছন্দেও ছিল আশ্চর্য মিল। দুজনেই জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ’-এর গান পছন্দ করতেন।

কিন্তু প্রায় ১৫ বছর আগে হঠাৎ তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে মীনা তখন প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন এবং সংসার ও সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ডিএনএ পরীক্ষার সূত্র

২০১৭ সালে ভারতে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন মীনা। সেখানে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পেরে নিজেরও পরীক্ষা করান। কিন্তু কোনো উল্লেখযোগ্য ম্যাচ পাননি। একপর্যায়ে ফোনের জায়গা খালি করার জন্য তিনি সেই ডিএনএ অ্যাপও মুছে ফেলেন। এরপর চলতি বছরের ২০ মে ফেসবুকে মিনালের একটি বার্তা পান মীনা।

বার্তায় লেখা ছিল—‘আমাকে মনে আছে?’

মিনাল এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন। পরীক্ষার ফলাফলের একটি স্ক্রিনশটও তিনি মীনাকে পাঠান।

Two longtime friends2

মীনা দ্রুত অ্যাপটি আবার ইনস্টল করেন। ফলাফল দেখার জন্য এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, কয়েকবার ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর অবশেষে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারেন। এরপর আসে জীবনের সবচেয়ে বড় চমক।

ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, তারা ‘১০০ শতাংশ ম্যাচ’। অর্থাৎ তারা শুধু আত্মীয় নন—তারা একই জৈবিক মা ও বাবার সন্তান, পূর্ণ সহোদর বোন।

‘আমার হারিয়ে যাওয়া অংশ’

ফলাফল দেখে মীনা আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কেঁদে ফেলেন। তার ভাষায়, এতদিন যে মানুষটিকে তিনি বোন বলে ডাকতেন, ডিএনএ পরীক্ষাই প্রমাণ করে দিল তার সেই অনুভূতি ভুল ছিল না। মীনার কাছে মিনাল হয়ে উঠলেন তার জীবনের ‘হারিয়ে যাওয়া অংশ’।

অন্যদিকে মিনাল প্রথমে ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলে মীনার নাম দেখে বুঝতেই পারেননি যে এটি সেই কিশোরী, যার সঙ্গে প্রায় তিন দশক আগে তার দেখা হয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মীনার ছবি দেখতে গিয়ে তার উপলব্ধি হয়—এ তো সেই মীনা!

মিনালের ভাষায়, তারা আগে বন্ধু ছিলেন, পরে জানতে পেরেছেন তারা বোন। অথচ বাস্তবে তারা পুরো সময়টাই বোন ছিলেন—শুধু কেউ তা জানতেন না।

আবেগঘন পুনর্মিলন

ডিএনএ পরীক্ষায় সত্যতা জানার পর আগস্টে বহু বছর পর প্রথমবার সামনাসামনি দেখা করেন দুই বোন। সেই সাক্ষাৎ ছিল আবেগে ভরা। কান্না, আলিঙ্গন ও হাসিতে কেটে যায় পুনর্মিলনের সময়।

মীনা বলেন, তার কাছে মুহূর্তটি ছিল ঘরে ফিরে আসার মতো। তিন সন্তানের মা মীনার ভাষায়, এত বছর ধরে দুজনের হৃদয়ে যে শূন্যতা ছিল, সেই শূন্যতা যেন পূর্ণ হয়েছে।

এরপর থেকে প্রায় এক দিন পরপরই তাদের কথা হচ্ছে। তারা একে অপরের জীবনসঙ্গী, সন্তান, ভাই ও মা-বাবার সঙ্গে দেখা করেছেন।

মীনা বলেন, তাদের মধ্যে এখনো সেই পুরোনো অদ্ভুত মিল স্পষ্ট। দুজন কীভাবে কথা বলেন, বাক্য শেষ করেন, মাথা নাড়েন কিংবা হাঁটেন—সবকিছুতেই আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

কখনো কখনো তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন। সময়ের হিসাব থাকে না। হঠাৎ মনে পড়ে যায়, বাজার করতে হবে কিংবা সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে আসতে হবে।

মুম্বাইয়ে ফেরার স্বপ্ন

দুই বোন এখন এমন একটি জায়গায় ফিরতে চান, যেখান থেকে তাদের জীবনের গল্প শুরু হয়েছিল—মুম্বাই।

মীনা বলেন, তারা একদিন একসঙ্গে ভারতে যেতে চান। মুম্বাইয়ের রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে চান, যে শহরে তারা জন্মেছিলেন এবং যেখান থেকে আলাদা পরিবারে তাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছিল। তবে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে কিছু আক্ষেপও।

জীবনের কঠিন সময়ে—বাবাকে হারানোর সময় কিংবা হৃদয় ভাঙার মুহূর্তে—তারা একে অপরের পাশে থাকতে পারেননি। অথচ তখন যদি জানতেন তারা বোন, তাহলে হয়তো একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতে পারতেন, আবার আনন্দের মুহূর্তগুলোও একসঙ্গে উদযাপন করতে পারতেন।

দশকের বন্ধুত্ব তাই শেষ পর্যন্ত নতুন এক পরিচয় পেয়েছে। যে দুই নারী একসময় নিজেদের অজান্তেই বোনের মতো বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন, ডিএনএ পরীক্ষা শুধু তাদের সম্পর্কের প্রমাণই দেয়নি—তাদের হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক ইতিহাসের একটি অংশও ফিরিয়ে দিয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

এমইউ
আরও পড়ুন