ইয়েমেনের দীর্ঘ যুদ্ধের ময়দানে হুথিরা ধীরে ধীরে এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা প্রচলিত যুদ্ধের বাইরে গিয়ে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, গেরিলা কৌশল, পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং সমুদ্রপথ সবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করছে। তাদের যুদ্ধের ধরনকে তাই অনেকটা অসম যুদ্ধের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখা হয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীর উত্থান ইয়েমেনের জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন থেকে। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথির নাম থেকেই তাদের ‘হুথি’ পরিচিতি এসেছে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর গোষ্ঠীটি ইয়েমেনের রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু হুথিদের সামরিক কৌশলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিস্তারের পর। এখন তারা শুধু ইয়েমেনের ভেতরে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে না; প্রয়োজনে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতেও সক্ষম।
অসম যুদ্ধই হুথিদের মূল শক্তি:
সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব বা ইসরায়েলের সঙ্গে হুথিদের তুলনা করা যায় না। কিন্তু তারা সেই অসমতাকেই নিজেদের কৌশলের অংশ বানিয়েছে। বড় বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে না গিয়ে তারা এমন অস্ত্র ও পদ্ধতি ব্যবহার করে, যার খরচ তুলনামূলক কম হলেও প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সামরিক অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
এই কৌশলের মূল দর্শন হলো- প্রতিপক্ষের শক্তির জায়গায় আঘাত না করে তার দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা। ফলে অত্যাধুনিক বিমান বা নৌবহরের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার পরিবর্তে হুথিরা দূরপাল্লার ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট নৌযান এবং ছড়িয়ে থাকা সামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করেছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা:
হুথিদের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৬ সালেও ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে ড্রোন হামলা যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। আল জাজিরার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুথিদের ড্রোন সক্ষমতার মধ্যে স্বল্পপাল্লার ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘপাল্লার একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনও রয়েছে। প্রায় এক দশকের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা তাদের এসব ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতা দিয়েছে।
এই অস্ত্রগুলোর সুবিধা হলো- মানববাহী যুদ্ধবিমানের তুলনায় এগুলো অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিচালনা বা উৎক্ষেপণ করা যায়। ফলে প্রতিপক্ষকে একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে হয়। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও সময়ের সঙ্গে উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, ইরানের সহায়তা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংযোজন ও প্রযুক্তি অভিযোজনের সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।
সমুদ্রপথকে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট বানানো:
হুথিদের সবচেয়ে আলোচিত কৌশলগুলোর একটি হলো লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবকে সামরিক চাপ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার। ২০২৩ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, ইয়েমেনের উপকূল থেকে অনেক দূরের সমুদ্রপথও তাদের যুদ্ধের অংশ হতে পারে। এর ফলে বহু জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় বেড়েছে। এখানেই হুথিদের কৌশলের বড় বৈশিষ্ট্যটি দেখা যায়। একটি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী একটি বিশাল সামুদ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; এটি প্রচলিত যুদ্ধের ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
ভূগোলকে অস্ত্র বানানোর কৌশল:
হুথিদের বর্তমান অগ্রযাত্রায় ভূগোল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকটপথ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিদের পশ্চিম ইয়েমেনের উপকূলে অগ্রসর হয়ে মোখা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং পরে মায়ুন বা পেরিম দ্বীপে পৌঁছানোর ঘটনা এই কৌশলগত বাস্তবতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মান্দাবের সরু অংশের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে এবং জলপথটিকে দুটি নৌপথে ভাগ করে।
অর্থাৎ, শুধু স্থলভূমি দখল নয়; সমুদ্রপথের কাছে অবস্থান তৈরি করাও হুথিদের সামরিক কৌশলের অংশ। এতে তারা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক নৌনিরাপত্তা এবং জ্বালানি পরিবহনের ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে।
পাহাড় ও দুর্গম ভূখণ্ড সুবিধা:
ইয়েমেনের পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ড হুথিদের জন্য দীর্ঘদিনের কৌশলগত সুবিধা। বড় সামরিক বাহিনী সাধারণত বিমান হামলা ও দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষের ঘাঁটি ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কিন্তু পাহাড়, গুহা ও দুর্গম এলাকায় অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক অবকাঠামো ছড়িয়ে রাখা হলে একযোগে সবকিছু ধ্বংস করা কঠিন হয়ে যায়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, হুথিদের অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ পাহাড়ি ভূখণ্ডে গোপন রাখার কৌশল তাদের বাহিনীকে ব্যাপক বিমান হামলার পরও টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। এটি আসলে পুরোনো গেরিলা যুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়।
ছড়িয়ে থাকা সামরিক অবকাঠামো:
হুথিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সামরিক সক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রাখা। বড় একটি ঘাঁটি ধ্বংস করা গেলে প্রচলিত বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম, কমান্ড ব্যবস্থা, অস্ত্রভাণ্ডার ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকলে একটি হামলায় পুরো বাহিনীকে অচল করা কঠিন। এই কারণে হুথিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিমান অভিযান অনেক সময় নির্দিষ্ট স্থাপনা ধ্বংস করতে পারলেও পুরো সংগঠনের সামরিক সক্ষমতা নির্মূল করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পাল্টা হামলার পরও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা টিকে থাকার বিষয়টি বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হিসাব:
হুথিদের কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়। একটি তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের হিসাব শুধু কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলো, তা দিয়ে করা যায় না। প্রশ্ন হলো- একটি হামলা ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে কত বেশি অর্থ, সামরিক সম্পদ ও রাজনৈতিক মূলধন ব্যয় করতে হলো। এটাই অসম যুদ্ধের অর্থনৈতিক যুক্তি।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও সমান গুরুত্বপূর্ণ:
হুথিদের যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের যুদ্ধ নয়; এটি প্রচার ও মনস্তত্ত্বের যুদ্ধও। সামরিক অভিযান, হামলার ভিডিও, সামরিক মুখপাত্রের বক্তব্য এবং রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করে। এতে একদিকে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে নিজেদের সমর্থকদের কাছে তারা শক্তিশালী প্রতিরোধকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগরের মতো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথে হামলা হলে তার প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশ্ববাজার, জ্বালানি মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একটি ছোট সামরিক অভিযানও আন্তর্জাতিক সংবাদে বড় রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত হয়।
ইরানের সহায়তা:
হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ইরানের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে ইরানকে হুথিদের প্রধান সামরিক সহায়তাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে তেহরান হুথিদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে।
তবে হুথিদের পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রিত একটি বাহিনী হিসেবে দেখাও অতিসরলীকরণ হবে। বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় থাকলেও হুথিদের নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্কটি অনেকটা পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের; ইরান আঞ্চলিক চাপ তৈরির জন্য হুথিদের সক্ষমতা থেকে সুবিধা পায়, আর হুথিরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমর্থন এবং সামরিক প্রযুক্তি থেকে লাভবান হয়।
হুথিদের মোকাবিলা কঠিনের কারণ:
হুথিদের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত কোনো একটি অস্ত্র নয়। বরং কয়েকটি কৌশলের সমন্বয়। পাহাড়ি ভূখণ্ড, গেরিলা অভিজ্ঞতা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র, ছড়িয়ে থাকা অবকাঠামো, সমুদ্রপথের কৌশলগত অবস্থান, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মানসিকতা সব মিলিয়ে তারা এমন একটি যুদ্ধব্যবস্থা তৈরি করেছে, যাকে প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে দ্রুত নিষ্ক্রিয় করা কঠিন। সাম্প্রতিক সময়ে মায়ুন বা পেরিম দ্বীপে তাদের অগ্রসর হওয়া এই কৌশলের আরেকটি দিক সামনে এনেছে- স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ভূগোলের ওপর প্রভাব বিস্তার।
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় ব্রিকসের নিন্দা: পেজেশকিয়ান
উত্তেজনা কমাতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে পাকিস্তান: শেহবাজ শরিফ
বৈশ্বিক সরবরাহে ৪ শতাংশ তেল ঘাটতির শঙ্কা
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে ইতিবাচক ফলের আশা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের
জর্ডানে ইরানের হামলায় চীনা স্যটেলাইট ব্যবহারের অভিযোগ
উচ্চ করের চাপে যুক্তরাজ্য ছাড়ছেন ধনীরা
ইরানি কার্গো জাহাজে হামলায় নিহত ১
গুলি করে হুথিদের পাঁচ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইয়েমেনি বাহিনীর