আনাদোলু'র বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন যুগ

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পিএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র প্রথমবারের মতো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। দূরপাল্লার হামলার পাশাপাশি মোবাইল প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত উৎক্ষেপণের সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার সময় কমিয়ে দেওয়ার কারণে ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সংঘাত।

চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো যুদ্ধে নিজেদের প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ইরানও খেইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানিয়েছে। দুই দেশের ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও উভয় ব্যবস্থাই দূর থেকে দ্রুত ও নির্ভুল হামলার দিকে আধুনিক যুদ্ধের অগ্রসর হওয়ার চিত্র তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ অভিষেক

প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর নতুন প্রজন্মের ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি পুরোনো আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেমের পরিবর্তে তৈরি করা হয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পাল্লা ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যেখানে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রাথমিক পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে আরও দূরে অবস্থান করেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ভবিষ্যৎ সংস্করণগুলোর পাল্লা ৬৫০ কিলোমিটার এবং পরবর্তী সংস্করণে অন্তত ১ হাজার কিলোমিটার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, ক্ষেপণাস্ত্রটি ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হিমার্স ও এম২৭০এ২ উৎক্ষেপণযান থেকে নিক্ষেপ করা যায়। একটি হিমার্সে যেখানে পুরোনো একটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়, সেখানে দুটি প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বহন করা সম্ভব।

তবে ইরান যুদ্ধে এর প্রথম ব্যবহার নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ১ মার্চ হিমার্স থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ভিডিও প্রকাশ করে। পরে দক্ষিণ ইরানের লামের্দ শহরে কয়েকটি হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কাজ করা ব্রিটিশ সংস্থা এয়ারওয়ার্স দাবি করেছে, লামের্দে তারা যে তিনটি হামলা বিশ্লেষণ করেছে, সেগুলোতে অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাত শিশু ও দুই নারী ছিলেন বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে।

ইরানের ‘দুর্গভেদী’ ক্ষেপণাস্ত্র

ইরানের খেইবার শেকান ভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তৈরি এই মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ২০২২ সালে উন্মোচন করা হয়। ইরানের দাবি অনুযায়ী, এর পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার, যা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আওতায় নিয়ে আসে।

ক্ষেপণাস্ত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কঠিন জ্বালানি ব্যবহার। তরল জ্বালানিনির্ভর ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কঠিন জ্বালানির ব্যবস্থায় উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি দ্রুত নেওয়া যায়। ফলে প্রতিপক্ষের পক্ষে উৎক্ষেপণের আগে ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত ও ধ্বংস করার সময় কমে আসে।

ইরানের দাবি, খেইবার শেকানের ওয়ারহেড শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এর চূড়ান্ত গতিপথ অনুমান করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ইরান চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক অবস্থানে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবিও করেছে।

আগস্টের শেষ দিকে ইরান জানায়, জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে খেইবার শেকান ব্যবহার করা হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত ও উত্তর ইরাকের এরবিলেও মার্কিন-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে তেহরান। তবে এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বদলে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের কৌশল

প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল ও খেইবার শেকান ভিন্ন শ্রেণির অস্ত্র হলেও উভয়টির মধ্যেই আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের একটি অভিন্ন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, দূরপাল্লা, দ্রুত উৎক্ষেপণ এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্ম।

মোবাইল উৎক্ষেপণযান ব্যবহারের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত করে ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বাড়তি পাল্লা সেনাবাহিনীকে নিজেদের অবস্থান থেকে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সুযোগ দেয়।

এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে প্রথমে উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে হয়, এরপর এর গতিপথ নির্ধারণ করে বুঝতে হয় সেটি কোন লক্ষ্যবস্তুর জন্য হুমকি। সবশেষে ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই তা প্রতিহত করতে হয়, যার জন্য হাতে থাকে মাত্র কয়েক মিনিট।

ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুধু নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহারই দেখাচ্ছে না; একই সঙ্গে দূরপাল্লার আক্রমণাত্মক অস্ত্র এবং সেগুলো ঠেকানোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আরও দ্রুত ও জটিল প্রতিযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়েরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন