ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে সৌদি আরবকে শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার পথ খুঁজতে হতে পারে বলে মনে করছেন জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাইরাস শায়েখ।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বর্তমান সংকটে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নতুন করে সাজাচ্ছে। তার মতে, দুই দেশই একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথও পুরোপুরি বন্ধ করছে না।
ইউএই-এর দুই দিকের কূটনীতি
শায়েখের মতে, ইউএই-এর অবস্থান দুই পক্ষের কূটনীতির একটি উদাহরণ। দেশটি সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের ঘোষণা দিলেও ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইউএই নেতৃত্বের উষ্ণ সম্পর্কের চিত্র দেখা গেছে। তার ভাষায়, আবুধাবি বুঝতে পারছে যে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। তাই একই সঙ্গে কঠোর অবস্থান এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুই পথেই এগোচ্ছে ইউএই।
এই কৌশলের পেছনে উপসাগরীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। কারণ ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সৌদি আরবের সামনে কঠিন সমীকরণ
সৌদি আরবের পরিস্থিতি আরও জটিল বলে মনে করেন শায়েখ। তার মতে, রিয়াদ একদিকে ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অগ্রগতির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে সৌদির হয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ করছে না।
রয়েটার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের অগ্রগতির পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন হামলায় অনুমোদন দেননি; ওয়াশিংটন বরং গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সময়ে হুথিদের অগ্রগতি সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা চাপ তৈরি করেছে। তারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে বাব আল-মান্দাবের দিকে এগিয়েছে বলে রয়েটার্স জানিয়েছে।
তিক্ত বাস্তবতা মেনে ইরানের সঙ্গে আলোচনা?
এই পরিস্থিতিতে শায়েখের বিশ্লেষণ হলো, সৌদি আরবকে হয়তো শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথে যেতে হতে পারে। তিনি বলেন, সৌদি আরব এমন এক অবস্থায় আটকে আছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সরাসরি সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না, আবার ইরান ও ওমানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার পথেও ওয়াশিংটনের চাপ রয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি আরও কঠিন হলে সৌদি নেতৃত্বকে হয়তো এই ‘তিক্ত বাস্তবতা’ মেনে নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
ওমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনায় ওমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো ও হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের আপত্তির কারণে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়েছে বলে এপি জানিয়েছে। অন্যদিকে রয়েটার্স জানিয়েছে, ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুথিদের প্রতিনিধিদের গোপন বৈঠকও হয়েছে। সেখানে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতির পথও সক্রিয় রয়েছে।
সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সরাসরি সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে অনিচ্ছুক হওয়ায় রিয়াদের সামনে নতুন কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে আসায় ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছ থেকেও সামরিক সহায়তা চাওয়ার খবর এসেছে। এখন পর্যন্ত এসব দেশ সরাসরি সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই। ফলে সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক- তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন হিসাব করতে হচ্ছে।
সামনে কোন পথে রিয়াদ?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার, হুথিদের সামরিক অগ্রগতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে অনীহার কারণে রিয়াদের কূটনৈতিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষের দিকে এগোতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু ইয়েমেন যুদ্ধের গতিপথই নয়, ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রিয়াদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্কের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে।
'হুথিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাবে সামরিকীকরণ চায় ইরান'
জার্মান চ্যান্সেলরের মন্তব্যকে 'বিকৃত বয়ান' বললেন বাঘাই
রামাল্লায় আলজাজিরার সাবেক সাংবাদিক আলা আল-রিমাওয়ি গ্রেপ্তার
চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা সফল: আরাঘচি