একসময় চীনকে নিয়ে কঠোর অবস্থানে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও চীনের শিল্পনীতিসহ নানা বিষয়ে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। তবে এখন সেই ট্রাম্পই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনকি ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শিকে স্বাগত জানাতে ট্রাম্প নিজেই বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করেছেন। এরপর হোয়াইট হাউসে অভ্যর্থনা, রোজ গার্ডেনে সামরিক কুচকাওয়াজ ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন রয়েছে।
শির এবারের সফর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। ২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে বাণিজ্য, বিরল খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ান ও ইরান যুদ্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীনের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছিল। একপর্যায়ে উভয় দেশ একে অপরের পণ্যে ১০০ শতাংশের বেশি পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের হুমকিও দেয়। এতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও বেইজিং শুল্কযুদ্ধে সাময়িক বিরতিতে যায়। সেই সমঝোতার মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে আসন্ন বৈঠকে এই বিরতির মেয়াদ বাড়ানো যায় কি না, সেটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কেনা বাড়ানো, বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ সহজ করা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাধা কমানোর মতো বিষয়ে অগ্রগতি চাইছে। অন্যদিকে বেইজিং চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরও কমানো এবং উন্নত মার্কিন প্রযুক্তিতে চীনা কোম্পানির প্রবেশাধিকার বাড়ানোর দাবি করছে।
ট্রাম্পের জন্য চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সমঝোতা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে মার্কিন জনগণের সামনে বাণিজ্যিক সাফল্য তুলে ধরতে চান ট্রাম্প। একই সময়ে ইরান যুদ্ধ ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে চাপ রয়েছে। চীন যদি মার্কিন কৃষিপণ্য, বোয়িং উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার বিষয়ে বড় ঘোষণা দেয়, সেটিকে ট্রাম্প প্রশাসন দৃশ্যমান অর্থনৈতিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
চীন এরই মধ্যে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে ৫০০টি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজসহ আরও বিমান থাকতে পারে।
চীনকে ঘিরে ট্রাম্পের নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিরল খনিজ। আধুনিক গাড়ি, স্মার্টফোন, সামরিক সরঞ্জাম, বিমান ও উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় এসব খনিজের সরবরাহে চীনের বড় প্রভাব রয়েছে। বেইজিং এই অবস্থানকে বাণিজ্য আলোচনায় দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন চায় চীন বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ সহজ করুক। বিপরীতে বেইজিং উন্নত মার্কিন প্রযুক্তিতে চীনা কোম্পানির প্রবেশাধিকার নিয়ে চাপ দিচ্ছে। ফলে আগের মতো শুধু শুল্ক দিয়ে চাপ সৃষ্টি না করে ট্রাম্প এখন শির সঙ্গে সরাসরি দর-কষাকষিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এমন ব্যাখ্যাও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চীনের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তারে শির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে শি এখন পর্যন্ত খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ট্রাম্পের জন্য শুধু বাণিজ্যের বিষয় নয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে শিকে যতই উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হোক, তাইওয়ান প্রশ্নে দুই দেশের বিরোধ রয়ে গেছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে আসছে। ট্রাম্প মে মাসে চীনের সঙ্গে বৈঠকের পর তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজকে ‘দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এ কারণে এশিয়ার কয়েকটি মার্কিন মিত্রদেশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে ট্রাম্প তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে পারেন। তবে এটি এখনো আশঙ্কা ও বিশ্লেষণের বিষয়; আসন্ন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এমন পরিবর্তন হবে এমন কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রয়োগে বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি। জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে এআই দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের বৈঠকেও এআই, বাণিজ্য ও বিরল খনিজ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তাহলে কি ট্রাম্পের চীনবিরোধী অবস্থান শেষ? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের চীননীতি এখন চাপ ও দর-কষাকষির সমন্বয়ে এগোচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে; অন্যদিকে শুল্কযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ, মার্কিন পণ্য বিক্রি, বিরল খনিজের সরবরাহ, ইরান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়ে সহযোগিতা বা সমঝোতার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ট্রাম্পের আগের কঠোর শুল্কনীতি চীনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল সব ক্ষেত্রে আনতে পারেনি। বরং বিরল খনিজের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার অন্যতম হাতিয়ার হয়েছে।
তাই শিকে ‘লালগালিচা’ অভ্যর্থনা দেওয়াকে চীনবিষয়ক নীতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখার চেয়ে কঠোর চাপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কূটনীতি ও অর্থনৈতিক দর-কষাকষির নতুন পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয় কি না, চীন বিরল খনিজ সরবরাহে ছাড় দেয় কি না এবং তাইওয়ান ও ইরান প্রশ্নে দুই নেতা কতটা সমঝোতায় পৌঁছান এসবই ট্রাম্পের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
হুথি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সৌদিতে নিহত ১, আহত ২
কুবির কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতীমের জানাজা সম্পন্ন, দাফন কোটবাড়িতে
একাদশে ভর্তি শুরু আজ, সঙ্গে রাখতে হবে যেসব কাগজপত্র
শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে প্রেম, শেষ পর্যন্ত বিয়ে
যুদ্ধ ও দমন-পীড়নের মূল্য দিচ্ছে ইরানের মানুষ: নোবেলজয়ী নার্গেস মোহাম্মাদি