লোহিত সাগর দখলের পর তেলসমৃদ্ধ পূর্ব ইয়েমেনের পথে হুথিরা

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

লোহিত সাগরের উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের পর এবার ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলের দিকে নজর দিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথিরা। গত এক সপ্তাহে উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে গোষ্ঠীটি। তাদের পরবর্তী অগ্রযাত্রার পথে এখন প্রধান বাধা সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।

সাম্প্রতিক এই অগ্রযাত্রা ইয়েমেনের ১২ বছরের গৃহযুদ্ধকে আবারও তীব্র করে তুলেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও তেলবাহী জাহাজে হামলা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হুথিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর মোখা দখলের পর বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে কয়েকটি দ্বীপও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে চলাচল করে। একই সময়ে হুথিরা আফ্রিকার দেশ জিবুতির মাত্র ৩২ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইয়েমেনের ভেতরে অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে জিবুতিতে পালিয়ে গেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ এডেন উপসাগর পেরিয়ে জিবুতিতে পৌঁছেছেন। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ১০ হাজার পর্যন্ত শরণার্থীর আগমন মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জিবুতি সরকার।

ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ মারিব প্রদেশের রাজধানী মারিব ও এর আশপাশেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র লড়াই হয়েছে। অতীতেও হুথিরা শহরটি দখলের চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর জন্য মারিব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাইজও হুথিদের হুমকির মুখে রয়েছে।

হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, সৌদি আরবকে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের ওপর দীর্ঘদিনের অবরোধ তুলে নিতে হবে। তার অভিযোগ, সৌদি আরবই ইয়েমেনের সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালির নৌ চলাচল বন্ধ করেছে এবং দেশটির ওপর অন্যায্য অবরোধ আরোপ করেছে।

তবে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব ও তার মিত্রদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বাইডেন ও ট্রাম্প প্রশাসনের সময় হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালালেও এবার সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। হুথিরাও যুক্তরাষ্ট্রকে এই লড়াইয়ের বাইরে রাখতে আগ্রহী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গোষ্ঠীটির দাবি, তারা কেবল সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।

বাব আল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে কমলেও পরে তা আবার বেড়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের হিসাবে, হুথিদের অগ্রযাত্রার আগে প্রতিদিন গড়ে ৩৫টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত। অগ্রযাত্রার পর তা ২৫-এ নেমে গেলেও রোববার সংখ্যা বেড়ে ৪৫-এ পৌঁছায়। তবে হুথিরা ভবিষ্যতে সৌদি জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের বাইরে আরও বিস্তৃত পরিসরে জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংঘাত পর্যবেক্ষকরা।

সংঘাত থামাতে আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও হুথি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন হুথি কর্মকর্তাসহ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা। অন্যদিকে তুরস্কের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উত্তেজনা কমাতে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তারা আলোচনা করছে।

ইয়েমেনে সৌদি আরব, ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ও পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিরও এটি প্রথম বড় পরীক্ষা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরব এখনো তাদের কাছে সহায়তার কোনো অনুরোধ জানায়নি।

এদিকে সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক দপ্তরের হিসাবে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে আটজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন। মোট প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে হুথিদের হামলায় প্রায় ১৫০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে এসব পরিসংখ্যানের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের আগেও আরব বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি ছিল। দীর্ঘ সংঘাত ও সৌদি-নেতৃত্বাধীন অবরোধের কারণে দেশটিতে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হয়েছে। হুথিদের হাতে জাতিসংঘ ও ত্রাণকর্মীদের আটক হওয়ার ঘটনাও নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে বাধা তৈরি করছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দপ্তর জানিয়েছে, ইয়েমেনের জন্য তাদের মানবিক সহায়তার আবেদনের মাত্র ২০ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে। ফলে লাখো মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা, পুষ্টি, পানি ও সুরক্ষা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

এএস
আরও পড়ুন