দেশের সব কওমি মাদ্রাসার জন্য জরুরি নির্দেশনা শিক্ষা বোর্ডের

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠন ও তা কার্যকর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশে অফিস ব্যবস্থাপক মু. অছিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হবে সংশোধন ও কল্যাণ। কোনো অবস্থাতেই তা প্রতিশোধমূলক হতে পারবে না। শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কেউ রাগের বশবর্তী হয়ে শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিতে পারবেন না। কোনো সমস্যা হলে প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা বা ধমকের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। একান্ত প্রয়োজন হলে অভিভাবককে ডেকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে কোনো পরিস্থিতিতেই শাস্তি হিসেবে শিক্ষার্থীকে প্রহার করা যাবে না। লাঠি, বেত বা অন্য কোনো উপকরণ দিয়ে আঘাত করা, মাথা-মুখ বা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা শরীরে দাগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন সব ধরনের শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শুধু শারীরিক শাস্তিই নয়, শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষায় সম্বোধন, অপমানজনক নামে ডাকা কিংবা যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনমূলক আচরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে সক্রিয় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ থাকলে তা ওই কমিটির কাছে জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা কমিটি না থাকা, কমিটি নিষ্ক্রিয় থাকা অথবা অভিযোগ পাওয়ার পরও যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক স্থগিত বা বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

নির্দেশনায় শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ইসলাহি মজলিস আয়োজনের পাশাপাশি নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিস এবং অভিভাবক সমাবেশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রম তদারকিতে প্রতিটি বোর্ডকে পৃথক ‘মাদ্রাসা মনিটরিং সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন চালু এবং অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ড, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের সময় প্রার্থীর চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনজীবী প্যানেলের মাধ্যমে আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে বোর্ডগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আল-হাইআতুল উলয়ার কেন্দ্রীয় হটলাইন ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।

আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, কেউ প্রকৃতপক্ষে অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা এবং অপরাধীকে কোনো ধরনের প্রশ্রয় না দেওয়াই তাদের নীতি। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার দায় পুরো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী কিংবা আলেম-উলামার ওপর চাপিয়ে দেওয়াকে তারা যৌক্তিক মনে করে না।

এমইউ
আরও পড়ুন