হাট ছাড়াই গ্রামে দিনে ৩০০ মণ করলার বেচাকেনা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ এএম

বিকেল গড়াতেই জমি থেকে সদ্য তোলা করলা নিয়ে কৃষকেরা জড়ো হতে থাকেন গ্রামের একটি নির্দিষ্ট স্থানে। কারও হাতে ব্যাগ, কারও সঙ্গে প্লাস্টিকের ক্যারেট। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দরদাম। রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এরপর ভোর হলেই পিকআপে করে সেই করলা ছুটে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে।

অবাক করা বিষয় হলো, জায়গাটি কোনো সরকারি ইজারাভুক্ত হাট নয়। জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের মসজিদের সামনের ফাঁকা জায়গায় প্রায় ১৫ বছর ধরে গড়ে উঠেছে করলার এই পাইকারি কেনাবেচার কেন্দ্র। কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই হাটের আনুষ্ঠানিক অবকাঠামো। অথচ প্রতিদিন এখানে বেচাকেনা হয় আড়াই শ থেকে ৩০০ মণ করলা।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই করলার বেচাকেনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়জন মহাজন নিয়মিত এখান থেকে করলা কিনছেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পরদিন সকাল থেকে বিকেলের মধ্যে পিকআপে করে এসব করলা পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন বাজারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের মসজিদের সামনের ফাঁকা জায়গায় অস্থায়ী ত্রিপলশেডের নিচে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ব্যাগ ও প্লাস্টিকের ক্যারেটভর্তি করলা। এক পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিক্রির অপেক্ষায় থাকা করলার বস্তা ও ক্যারেট। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকটি পিকআপ। আগের সন্ধ্যায় করলা বিক্রি করা কয়েকজন কৃষক মহাজনের কাছ থেকে তাঁদের পাওনা টাকা বুঝে নিচ্ছিলেন।

স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এক মণ করলা ২ হাজার ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। কয়েক দিন আগে দাম আরও কম ছিল। তাঁর মতে, স্থানীয় হাটের তুলনায় এখানে ভালো দাম পাওয়া যায় বলেই কৃষকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে এই কেন্দ্রে করলা নিয়ে আসেন।

শুধু করলা কেনাবেচার জায়গা হিসেবেই নয়, উৎপাদনস্থল থেকে দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজি পৌঁছে দেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে কেন্দ্রটিকে ঘিরে। মহাজনেরা কৃষকদের কাছ থেকে করলা কেনার পর সেগুলো বাছাই ও প্যাকেটজাত করেন। পরে পিকআপে করে পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন জেলার বাজারে।

মহাজন বাবু মণ্ডল বলেন, প্রতিদিন আড়াই শ থেকে ৩০০ মণ করলা এখানে আসে। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কেনাবেচা চলে। পরদিন সকাল থেকে বিকেলের মধ্যে এসব করলা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কৃষকেরা জানান, মাঠের কাছাকাছি বিক্রিকেন্দ্র হওয়ায় তাঁদের সময় ও পরিবহন—দুই ধরনের খরচই কমছে। বিকেলে জমি থেকে করলা তুলে এনে রাতের মধ্যেই বিক্রি করে দিতে পারছেন তাঁরা। ফলে পরদিন আবার জমিতে গিয়ে কৃষিকাজে সময় দিতে পারছেন।

ক্ষেতলাল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের ওপর করলার দাম ওঠানামা করে। কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।

ধান ও আলুর জন্য পরিচিত ক্ষেতলালে এখন বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষও বাড়ছে। উঁচু জমিতে করলার পাশাপাশি পটল, বেগুন, চিচিঙ্গা, লাউ ও শসার আবাদ করছেন কৃষকেরা। এসবের মধ্যে করলাকে ঘিরে বাখেরা কোমলগাড়ী গ্রামের এই কেন্দ্রটি কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে পৌঁছে দেওয়ার স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

এমইউ
আরও পড়ুন