ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর উত্তেজনা নতুন করে বাড়ার মধ্যে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করছে পোল্যান্ড। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দেশটির আকাশসীমায় রুশ সামরিক উড়োজাহাজ ও ড্রোনের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের একাধিক ঘটনা সামনে আসার পর পূর্বাঞ্চলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার নজরদারি ও যুদ্ধবিমানের প্রস্তুতি বাড়িয়েছে ওয়ারশ।
পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ বলেছেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ভবিষ্যতে পোলিশ আকাশসীমা লঙ্ঘনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২২ সেপ্টেম্বর ইউক্রেন সীমান্তের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, লুবলিন ও মাজোভিয়া অঞ্চলে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় দুর্গ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং ড্রোন প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ২৩ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার একটি এমআই-৮ হেলিকপ্টার কালিনিনগ্রাদ দিক থেকে পোলিশ আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। প্রায় ৪২ সেকেন্ড এটি পোলিশ আকাশসীমায় অবস্থান করে বলে ওয়ারশের দাবি।
ঘটনাটিকে সাধারণ বিচ্যুতি হিসেবে না দেখে পোল্যান্ডের সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড বলেছে, এর ধরন দেখে মনে হয়েছে রাশিয়া আবারও পোল্যান্ডের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা প্রস্তুত, তা পরীক্ষা করছে। ওই ঘটনার পর পোলিশ যুদ্ধবিমানকে আকাশে পাঠানো হয় এবং স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়।
এর আগেও ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে রুশ হামলার সময় পোল্যান্ড একাধিকবার যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠিয়েছে। বিশেষ করে লুবলিন ও রেজেসজভ অঞ্চলে সতর্কতা জারি হওয়ায় বিমানবন্দর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পোল্যান্ডের বিমানবাহিনী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় আকাশসীমায় প্রতিরোধমূলক টহল বাড়ায়। এর সঙ্গে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের তৎপরতাও বাড়ানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক দেশটির পার্লামেন্টে সতর্ক করে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী আগামী কয়েক মাসে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ন্যাটো দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড’ হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করা এবং কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা।
তবে টাস্কের বক্তব্যকে নির্দিষ্ট কোনো হামলার তারিখ বা লক্ষ্যবস্তুর ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি মূলত পোলিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নের কথা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে পোল্যান্ড একা কাজ করছে না। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতিও বাড়ছে।
চেক প্রজাতন্ত্রের হেলিকপ্টার পোল্যান্ডে কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সঙ্গে স্লোভাকিয়া নতুন রাডার ব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পোল্যান্ড নিজেও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, রাডার, ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং সুরক্ষিত সামরিক অবস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
পোলিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটোর ‘ইস্টার্ন সেন্ট্রি’ মিশন আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর আকাশসীমায় রুশ অনুপ্রবেশের পর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা জোরদারের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
পোল্যান্ডের সাম্প্রতিক সামরিক প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উচ্চ সতর্কতা জারি হলেও প্রতিবারই যে পোলিশ আকাশসীমা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা নয়।
১৯ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনে রুশ হামলার সময় পোল্যান্ড প্রতিরোধমূলক বিমান অভিযান পরিচালনা করে। স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার ইউনিটগুলোকে উচ্চ প্রস্তুতিতে নেওয়া হয়। পরে পোলিশ সেনাবাহিনী জানায়, ওই সময় পোলিশ আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় পোল্যান্ডের প্রস্তুতির বড় একটি অংশই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে পোল্যান্ড ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাঞ্চলীয় দেশ। দেশটির সীমান্ত ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্ত এবং ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পোল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও লজিস্টিক কেন্দ্র।
ফলে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে রুশ হামলা বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পোল্যান্ডের সীমান্ত নিরাপত্তায় পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন অবকাঠামো ও সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রও রুশ হামলার আওতায় এসেছে বলে পোলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।
পোল্যান্ডের আশঙ্কা শুধু প্রচলিত সামরিক হামলা নিয়ে নয়। ড্রোন, সাইবার হামলা, নাশকতা, সীমান্তে উসকানি ও তথ্যযুদ্ধ এসবকেও সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড’ হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটি।
পোল্যান্ডের বর্তমান সতর্কতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্ন। কোনো ন্যাটো সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা হলে জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু সীমিত ড্রোন অনুপ্রবেশ, সামরিক উড়োজাহাজের স্বল্প সময়ের আকাশসীমা লঙ্ঘন বা সীমান্তবর্তী নাশকতার মতো ঘটনা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে এটি তুলনামূলক জটিল প্রশ্ন।
ইউরোপের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাও সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সম্ভাব্য সীমিত উসকানি বা ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার আশঙ্কার কথা বলেছেন। তবে একই সঙ্গে বাল্টিক অঞ্চলের কিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত করাও পরিস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তপ্ত করতে পারে।
পোল্যান্ড ও অন্যান্য ন্যাটো দেশগুলো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে রুশ উসকানি হিসেবে দেখলেও মস্কো ন্যাটো দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা বা পরিকল্পিত উসকানির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ফলে পোল্যান্ডের সামরিক প্রস্তুতির পেছনে যেসব গোয়েন্দা মূল্যায়ন রয়েছে, সেগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
তবে বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, রাশিয়া-ন্যাটোর মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চলে দুর্ঘটনা, অনুপ্রবেশ কিংবা ভুল হিসাব থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। পোল্যান্ড তাই সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা নয়, বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগে থেকেই আকাশ প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়ারশর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ যেন পোলিশ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে না পড়ে এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আকাশসীমা লঙ্ঘন বা ড্রোন হামলা হলে দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিহত করা যায়। একই সঙ্গে ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা।
ফ্রান্সের জয়ের দিনে মাঠ ছাড়তে হলো এমবাপ্পেকে, দুশ্চিন্তায় রিয়ালও
জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী
পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবই তাহলে মানছে পেজেশকিয়ান?
‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ ছড়িয়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে চেয়েছেন নেতানিয়াহু: মামদানি