যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছে ইরানের কট্টরপন্থী দৈনিক কায়হান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে খুলে দেওয়ার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটিকেও ‘দুর্বলতার সংকেত’ বলে আখ্যা দিয়েছে পত্রিকাটি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তুলে ধরছেন, ঠিক তখনই কায়হানের এমন অবস্থান তেহরানের অভ্যন্তরীণ নীতিগত বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে।
কায়হান প্রকাশিত হয় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে। ফলে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় অবস্থানকে সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে সরাসরি ধরে নেওয়া যায় না। তবে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর কট্টরপন্থী অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মতামত হিসেবে এর বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
কায়হানের একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল—‘প্রতিশোধ নেওয়া ইরানি জাতির দাবি; ট্রাম্পকে হত্যা করতে হবে’।
নিবন্ধটিতে বলা হয়, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ধর্মীয় দায়িত্ব। সেই প্রতিশোধ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কূটনীতিকদের নেই বলেও দাবি করা হয়।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ইরানি সরকার ট্রাম্প বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার চেষ্টা করছে—এমন অবস্থান তেহরানের নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। কায়হান মূলত এই অবস্থানেরই সমালোচনা করেছে।
তবে কায়হানের এই আহ্বানকে ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপনের মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কায়হানের সমালোচনার আরেকটি বড় লক্ষ্য ইরানের সাত দিনের হরমুজ প্রস্তাব।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সাত দিনের রোডম্যাপের কথা তুলে ধরেছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলে এবং নির্দিষ্ট অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা শুরু করা সম্ভব হবে।
কায়হান এই উদ্যোগকে উল্টো ‘দুর্বলতার সংকেত’ হিসেবে দেখেছে।
পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত leverage বা দর-কষাকষির হাতিয়ার। তাই আলোচনার বিনিময়ে দ্রুত এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ ইরানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে কট্টরপন্থী মহলটি মনে করছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা নিয়েও আপত্তি
কায়হানের মন্তব্য শুধু হরমুজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াকেই পত্রিকাটি সন্দেহের চোখে দেখেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে ‘অবিশ্বাসের পরিবেশ’ রয়েছে। তবে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে আলোচনা হলে ইরান চুক্তি মেনে চলবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
আরাঘচিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের কাছে দেওয়া প্রস্তাবের লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধের অবসান, হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করা।
কায়হানের অবস্থান এর বিপরীত। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা মূলত ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার একটি কৌশল হতে পারে।
৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়েও বিরোধ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কায়হান কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমানো বা এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনার বিরোধিতা করেছে পত্রিকাটি। কট্টরপন্থী মহলের যুক্তি, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ছাড় দিলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা নিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে পরমাণু স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শন নিয়েও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেছেন তিনি।
ফলে একই দেশের ভেতরে এখন দুটি ভিন্ন বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—একদিকে কূটনীতির মাধ্যমে সংকট কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে কট্টরপন্থী অংশের সর্বোচ্চ চাপ বজায় রাখার দাবি।
২৬ বছর ধরে ঘাস-লতাপাতা খেয়েই জীবন, ৬৬ বছরেও সতেজ অমল কৃষ্ণ
পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবই তাহলে মানছে পেজেশকিয়ান?