নতুন বিশ্বে ইরান-চীন দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান গালিবাফের

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

ইরান ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বলেছেন, দুই প্রাচীন এশীয় সভ্যতার দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে ভবিষ্যতমুখী ও টেকসই অংশীদারত্বে রূপ দিতে হবে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন।

গালিবাফ বলেন, গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, অতীতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি অনেক ধারণা এখনকার বিশ্বকে আর ব্যাখ্যা করতে পারছে না। ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, তা নির্ধারণে স্বাধীন দেশগুলোর বর্তমান সিদ্ধান্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইরান ও চীন, দুই প্রাচীন এশীয় সভ্যতা, ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে উল্লেখ করে গালিবাফ বলেন, দুই দেশের অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে, কোনো দেশ নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করতে না পারলে স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে না। যুদ্ধ, বহিরাগত চাপ এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার মুখেও ইরান জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্ব দেখিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য, ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে শক্তির কাছে আত্মসমর্পণও করবে না। ইরানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব একাই কোনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেশের ওপর রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং ইরান এ অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বের জন্য যে বার্তা দিতে চায়, তা যুদ্ধের নয়; পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে শান্তির।

গালিবাফ বলেন, দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যখন বড়-ছোট সব দেশই সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করবে। যুদ্ধ, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক হুমকি ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইরান ও চীনের মধ্যে স্বাধীনতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে উন্নয়নের বিষয়ে অভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন গালিবাফ। তবে তিনি বলেন, স্বাধীনতার অর্থ বিচ্ছিন্নতা নয়। সহযোগিতা, বাণিজ্য, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে আরও টেকসই করা সম্ভব।

বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে উল্লেখ করে গালিবাফ বলেন, এমন একটি সময়ের অবসান ঘটছে, যখন একটি একক শক্তি বা সীমিতসংখ্যক শক্তি বিশ্বের নিয়ম নির্ধারণ করে অন্যদের তা মেনে চলতে বাধ্য করতে পারত। এশিয়া অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জনসংখ্যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ভূমিকাও বাড়ছে। তার মতে, এসব পরিবর্তনকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে না দেখে আরও ন্যায়সংগত ও স্থিতিশীল ব্যবস্থা গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

তবে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব মানেই শুধু বড় শক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, ন্যায্য নিয়ম, পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বশীলতা ছাড়া বহুমেরুকেন্দ্রিকতাও অস্থিতিশীলতার কারণ হতে পারে। এ কারণে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, দ্বৈত মানদণ্ডের বিরোধিতা, শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি, সভ্যতার বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সুযোগের ন্যায্য বণ্টন প্রয়োজন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন একটি সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার ভাবনা এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে চীনের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতি ইরানের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন গালিবাফ। তিনি বলেন, একতরফা আধিপত্যের বদলে সংলাপ, উন্নয়ন ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের নতুন সমাধান খুঁজতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময় দেশটির উন্নয়নধারা ইরান গভীর আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি। উচ্চমানের উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, নতুন উৎপাদনশক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিশ্বের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের উন্মুক্ততা, চীনের এসব অগ্রাধিকার ইরানের মতো অংশীদারদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইরানের অর্থনীতিকে শুধু তেল ও গ্যাসের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন গালিবাফ। তিনি বলেন, ইরানের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল সক্ষমতা, বিপুল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, শিল্প ও কৃষি সক্ষমতা, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং মধ্য এশিয়া, ককেশাস, পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর, ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে সংযুক্তকারী ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে।

চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রাধিকারের সঙ্গে ইরানের সক্ষমতার সমন্বয় হলে সহযোগিতার নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হতে পারে বলে জানান তিনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, আধুনিক কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, রেলপথ, বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে যৌথ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গালিবাফ বলেন, ইরান শুধু চীনের জ্বালানি সরবরাহকারী কিংবা চীন শুধু ইরানের তেল ক্রেতা বা পণ্য রপ্তানিকারক হিসেবে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ইরান-চীন সম্পর্কের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তব সহযোগিতা দুই দেশের সম্ভাবনার তুলনায় সবসময় এগোয়নি বলেও স্বীকার করেন গালিবাফ। প্রশাসনিক জটিলতা, অগ্রাধিকারের পরিবর্তন, বহিরাগত চাপ, একে অপরের বাজার সম্পর্কে অর্থনৈতিক অংশীজনদের অপর্যাপ্ত জ্ঞান এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক বাস্তবায়নের ব্যবধানের কারণে সহযোগিতার সম্ভাবনার একটি অংশ কাজে লাগানো যায়নি বলে জানান তিনি।

তবে এ পরিস্থিতিকে তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত মতবিরোধের লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন গালিবাফ। বরং দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই বিষয়টি দেখা উচিত। ব্যাংক, কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি কেন্দ্র, প্রদেশ, শহর, বাণিজ্যিক সংগঠন, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং দুই দেশের জনগণকে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার আহ্বান জানান তিনি।

ইরান ও চীনের ২৫ বছর মেয়াদি ব্যাপক সহযোগিতা পরিকল্পনাকে এ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একটি কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে গালিবাফ বলেন, যেকোনো কৌশলগত নথির সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। তাই শুধু সহযোগিতা ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তব প্রকল্প এবং পরিমাপযোগ্য যৌথ অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরির দিকে যেতে হবে।

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানকে চীন ও পশ্চিম এশিয়ার মধ্যে সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে গালিবাফ বলেন, চীন-কেন্দ্রিক মধ্য এশিয়া-ইরান রেলপথের উন্নয়ন, তুরস্ক ও ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ, উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের উন্নয়ন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর ব্যবহার এবং যৌথ পরিবহন ও উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন ইরানকে চীনের সঙ্গে পশ্চিম এশিয়া ও এর বাইরের অঞ্চলের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ পথে পরিণত করতে পারে।

তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়া গত কয়েক দশকে যুদ্ধ, উগ্রবাদ, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও কিছু অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে বড় মূল্য দিয়েছে। এখন এ অঞ্চলে উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপত্তা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের একটি ভিন্ন ধারা শক্তিশালী করার সময় এসেছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবহন করিডোর, যৌথ বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে চীনসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য ইরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন গালিবাফ। ইরান ও চীনের মধ্যে ভ্রমণ সহজ করা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা জোরদার করা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া গভীর করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, ইরান-চীন কৌশলগত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া ও আস্থা।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে গালিবাফ বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যেও ইরান ও চীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে পেরেছে। এখন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে টেকসই, প্রাতিষ্ঠানিক ও ভবিষ্যতমুখী অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। তার মতে, এ অংশীদারত্বে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক, সবকিছুর সমন্বয় থাকতে হবে।

তিনি বলেন, চীন নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে উন্নয়নের একটি উল্লেখযোগ্য পথ তৈরি করেছে। ইরানও নিজস্ব জাতীয় সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এবং বিশ্বস্ত বন্ধু ও অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে জনগণের জন্য আরও নিরাপদ ও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৬তম বছরে ইরানের বার্তা স্পষ্ট উল্লেখ করে গালিবাফ বলেন, দুই দেশ নিজেদের বন্ধুত্বের ইতিহাসকে সম্মান করে, তবে তাদের দৃষ্টি ভবিষ্যতের দিকে। তেহরান বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্জনে, চুক্তিকে প্রকল্পে এবং সরকার-টু-সরকার সহযোগিতাকে জনগণ-টু-জনগণ অংশীদারত্বে রূপ দিতে প্রস্তুত।

তার ভাষ্য, ইরান ও চীন দুই প্রাচীন সভ্যতা হলেও বর্তমানের দায়িত্ব হলো ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা, এমন এক ভবিষ্যৎ, যেখানে এশিয়া শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হয়ে মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হবে। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত