ট্যাংকারে হামলার মধ্যেও রেকর্ড করলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৫ এএম

হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায় ছাড়িয়ে গেছে। রয়টার্সের পর্যালোচিত জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে চার দিন মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব গড়ের ওপরে ছিল।

জাহাজ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান Kpler-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর এবং ২৭ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর—এই চার দিনে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রতিদিন ১ কোটি ৯৫ লাখ থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেলের মধ্যে ওঠানামা করে।

যুদ্ধ শুরুর আগে, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির দৈনিক গড় ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল। ১ অক্টোবর সাত দিনের চলমান গড় দাঁড়ায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যারেলে।

বিকল্প রুটে ঘুরছে তেল

রপ্তানি বেড়ে গেলেও এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে তেল পরিবহন হচ্ছে। Kpler-এর বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ বিকল্প পথে যাচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে ইরানকে বাদ দিলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রতিদিন রপ্তানি হয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব গড়ের কাছাকাছি। তবে যুদ্ধের আগে এ অঞ্চলের প্রায় ৮৩ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। সেপ্টেম্বরে এই হার কমে প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে আসে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন এবং রেড সি বা লোহিত সাগরপথ ব্যবহার বেড়েছে।

Kpler-এর হিসাবে, সেপ্টেম্বরের রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ হরমুজ এড়িয়ে অন্য পথ দিয়ে বের হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন হয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন হয়ে ফুজাইরাহ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করছে।

হরমুজে হামলা অব্যাহত

তেলের প্রবাহ বাড়লেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা Marisks জানিয়েছে, হরমুজ ও আশপাশের এলাকায় অন্তত সাতটি জাহাজ হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

১ অক্টোবর খুব বড় আকারের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ Kazimah III একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরে জাহাজটির সব নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে Marisks জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের Maritime Trade Operations সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবর থেকে হরমুজ প্রণালি অথবা এডেন উপসাগর এলাকায় প্রতিদিন অন্তত একটি করে হামলার ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। Marisks বলেছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি ‘উচ্চ ও ক্রমেই অনির্দেশ্য’ হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে সপ্তাহান্তে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করে এবং রোববার কোনো জাহাজের চলাচল নিবন্ধিত হয়নি। আগের সপ্তাহান্তে এই সংখ্যা ছিল ৩১টি।

এলএনজি রপ্তানিতেও উত্থান

শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনও সেপ্টেম্বরে বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে হরমুজ দিয়ে বের হওয়া এলএনজি কার্গোর সংখ্যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। এর মধ্যে ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাস ক্যারিয়ার, বাল্ক ক্যারিয়ার ও কনটেইনার জাহাজ। বৈশ্বিক দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

সরবরাহ বাড়লেও ঝুঁকি কাটেনি

মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসায় আপাতত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। একই সময়ে জি৭ দেশগুলোও জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে তেলের দামে সাময়িক চাপ কমেছে।

তবে তেল রপ্তানি পুনরুদ্ধারের বর্তমান চিত্রকে পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, রপ্তানির একটি বড় অংশ এখন বিকল্প পাইপলাইন, লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ বদলের মতো জটিল ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে হরমুজে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায় ছাড়িয়ে গেলেও সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে—হরমুজ প্রণালিতে হামলা অব্যাহত থাকলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ইরানের রপ্তানি বর্তমানে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের তুলনায় ব্যাপকভাবে কম থাকায় সামগ্রিক আঞ্চলিক সরবরাহের হিসাবেও এর প্রভাব রয়েছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন