বাঁচতে নিজের পা নিজেই কেটে ফেলেন ইউক্রেনীয় সেনা!

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

যুদ্ধক্ষেত্রে বেঁচে থাকার জন্য নিজের শরীরের একটি পা নিজেই কেটে ফেলেছিলেন ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। আহত অবস্থায় প্রায় আট মাস একটি বোমায় বিধ্বস্ত স্কুলের বয়লার কক্ষে লুকিয়ে থাকার পর শেষ পর্যন্ত তাকে উদ্ধার করা হয়েছে বিশেষভাবে অভিযোজিত একটি ভারী ড্রোনের সাহায্যে। ছয়টি প্রপেলারযুক্ত ড্রোনে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই অসাধারণ বেঁচে থাকা ও উদ্ধারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।

৪৯ বছর বয়সী ভ্লাসেনকো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন। ওই হামলায় তাঁর বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ডান পা-ও ভেঙে বেঁকে গিয়েছিল। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

হামলার পর একটি বোমায় বিধ্বস্ত স্কুলের বয়লার কক্ষের নিচে গর্তের মতো জায়গায় আশ্রয় নেন ভ্লাসেনকো। সেখানে দীর্ঘদিন আটকে থাকার একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, বেঁচে থাকতে হলে তাঁকে নিজের অবশিষ্ট পা-টিও বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

প্রায় তিন মাস পর মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে তিনি ছুরি দিয়ে নিজের ডান পা কেটে ফেলেন। এরপর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে টুর্নিকেট ব্যবহার করেন।

প্রচণ্ড যন্ত্রণা ও হতাশার মধ্যেও তিনি বেঁচে ছিলেন। তবে তাঁর ধারণা হয়েছিল, সেখান থেকে আর কখনো উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হবে না।

রয়টার্সকে হাসপাতালের শয্যায় বসে ভ্লাসেনকো বলেন, “আমি তো নিজেকেই আগেই কবর দিয়ে ফেলেছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।”

ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ভ্লাসেনকো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে মোট ৪৯১ দিন কাটিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় আট মাস তিনি ওই বয়লার কক্ষে আটকে ছিলেন।

সম্মুখসারির ওই অঞ্চলকে ‘কিল জোন’ বলা হয়। কারণ, সেখানে বিপুলসংখ্যক ড্রোন আকাশে টহল দেয়। ফলে যেকোনো সময় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। উভয় পক্ষের সেনাদের গভীর ভূগর্ভস্থ আশ্রয় বা গর্তে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেক সেনা মাসের পর মাস নিজেদের অবস্থান থেকে বের হতে পারছেন না। ড্রোনের নজরদারি ও হামলার কারণে আহতদের সরিয়ে নেওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত ৪ অক্টোবর ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারে বিশেষভাবে অভিযোজিত ‘আয়ুদাগ-৬’ (Ayudag-6) নামের একটি ভারী ড্রোন ব্যবহার করা হয়। ছয়টি রোটরযুক্ত ড্রোনটি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।

উদ্ধারের সময় ভ্লাসেনকোকে একটি বিশেষ হারনেস বা নিরাপত্তাবেষ্টনীতে বেঁধে ড্রোনের সঙ্গে ঝুলিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ড্রোনটি তাঁকে আকাশপথে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়।

উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য আরও তিনটি ‘ভ্যাম্পায়ার’ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল উদ্ধারকারী ড্রোনকে রুশ ড্রোনের আক্রমণ বা নজরদারি থেকে রক্ষা করতে বিভ্রান্তি তৈরি করা।

ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, এটি ছিল ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে আকাশপথে উদ্ধারের প্রথম জানা ঘটনা। তবে দাবিটির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের বিষয়ে রয়টার্স সতর্কতা জানিয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন শুধু হামলা ও নজরদারির অস্ত্র হিসেবে নয়, আহত সেনাদের উদ্ধারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এ ধরনের অভিযানে ড্রোনের বহনক্ষমতা, ব্যাটারির শক্তি, আবহাওয়া, শত্রুপক্ষের নজরদারি এবং আহত ব্যক্তির নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ।

ভ্লাসেনকোর উদ্ধার দেখিয়েছে, অত্যন্ত বিপজ্জনক এলাকায় প্রচলিত স্থলপথে উদ্ধার অভিযান অসম্ভব হয়ে উঠলে বিশেষ প্রযুক্তি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনাটি যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা আহত সেনাদের দুর্দশার কথাও সামনে এনেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর অভিজ্ঞতার বিবরণ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য ও উদ্ধারকারী ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। তবে তাঁর বর্ণনার সব উপাদান সংবাদ সংস্থাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

সূত্র: রয়টার্স

এএইচএ
আরও পড়ুন