যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় ব্যয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচনি অর্থায়ন পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ওপেনসিক্রেটসের (OpenSecrets) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এটি ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ৩ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী সংগঠন বিপুল অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে। বিশেষ করে ধনকুবেরদের অর্থায়নে পরিচালিত রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটিগুলোর (সুপার পিএসি) ব্যয় নির্বাচনি প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রচারে অর্থের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) ও সুপার পিএসিগুলো। প্রার্থীরা ব্যয় করেছেন প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। আর রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটির ব্যয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
নির্বাচনের শেষ কয়েক মাসে পিএসি ও সুপার পিএসিগুলোর ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নির্বাচনের পর সব ব্যয়ের হিসাব জমা ও প্রকাশিত হলে চূড়ান্ত পরিমাণ জানা যাবে। ওপেনসিক্রেটস অতীতের নির্বাচনি ব্যয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে মোট ব্যয় ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবচেয়ে বড় অর্থদাতা হিসেবে উঠে এসেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও ধনকুবের ইলন মাস্ক। অক্টোবর পর্যন্ত তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। বিশেষ করে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনি লড়াইয়ে তার অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য। মাস্কের একাধিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এ অঙ্গরাজ্যে থাকায় সেখানকার নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার অর্থায়ন বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। রিপাবলিকানদের পক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন আরও কয়েকজন ধনকুবের। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী জেফ ইয়াস এবং ব্যবসায়ী রিচার্ড ও এলিজাবেথ উহেলিন। তাদের প্রত্যেকের অর্থায়নও নির্বাচনি প্রচারে বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের বড় অর্থদাতাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক নিউইয়র্ক সিটির মেয়র ও ব্যবসায়ী মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি ডেমোক্র্যাটপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে ৬ কোটি ডলারের বেশি দিয়েছেন। এছাড়া ধনকুবের জর্জ সোরোস প্রতিষ্ঠিত জিওসোর করপোরেশন ও ফান্ড ফর পলিসি রিফর্ম সম্মিলিতভাবে উদারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার দিয়েছে।
ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচনের শীর্ষ ৪০ জন অর্থদাতা মোট ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ২৪০ কোটি ডলার দিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো চক্রে এই সময় পর্যন্ত এটি রেকর্ড পরিমাণ অর্থায়ন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ মাইকেল বেকেল বলেছেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয় অতীতের রেকর্ড ভাঙছে। এবারের নির্বাচনে অর্থের বড় অংশ আসছে সবচেয়ে ধনী দাতা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনি প্রচারে বিপুল অর্থের প্রবাহ প্রার্থীদের প্রচার, বিজ্ঞাপন, প্রচারণার কৌশল এবং ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি অর্থায়ন ব্যবস্থায় সুপার পিএসি বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন। প্রচলিত নিয়মে ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ পিএসিরা প্রার্থীদের সরাসরি অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে। কিন্তু সুপার পিএসিগুলো ব্যক্তি, করপোরেশন, শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য রাজনৈতিক কমিটির কাছ থেকে সীমাহীন অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। তবে তারা সরাসরি কোনো প্রার্থীর নির্বাচনি তহবিলে অর্থ দিতে পারে না। প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে বিজ্ঞাপন, প্রচার ও অন্যান্য স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যয় করতে পারে। এ কারণে ধনকুবের ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুপার পিএসির মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারছে।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি অর্থায়নব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে অল্পসংখ্যক ধনকুবের ও প্রভাবশালী সংগঠন বিপুল অর্থ ব্যয় করায় রাজনৈতিক প্রচারে সাধারণ ভোটারদের তুলনায় বিত্তশালীদের প্রভাব বেশি হয়ে উঠছে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেই কোনো প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত হয় না। ভোটারদের মনোভাব, অর্থনীতি, স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের লড়াই নয়; যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের সম্পর্ক কতটা গভীর হয়েছে, সেটিও এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ আজকের ভোট?
মার্কিন বিমানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দোহাই দিয়ে কেশম দ্বীপে হামলা
নির্বাচনের আগেই ট্রাম্পের পরাজয়!
'যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম' মন্তব্য করার পরই ইরানে হামলা চালালো ট্রাম্প
হরমুজের আকাশে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের