মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসে। বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা—একটির পর একটি খরচ মেটাতে না মেটাতেই টাকার বড় অংশ শেষ। মাসের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয় হিসাবের টানাপোড়েন। শেষ সপ্তাহে ধার, বাকিতে বাজার কিংবা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায়, মাস শেষে বেতনের চেয়ে খরচই বেশি।
বাংলাদেশে এই সংকট এখন কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়; জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জীবনযাত্রার মান জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে আয়ের তুলনায় ব্যয় ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি।
জরিপে আরও দেখা গেছে, গত এক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ। জরিপটি দেশের ১৫০টি নমুনা এলাকায় ৩ হাজার পরিবারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ খাবারের পাশাপাশি বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার ব্যয়ও পরিবারের বাজেটে চাপ তৈরি করছে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু খরচ কমানোর পরামর্শ যথেষ্ট নয়। দরকার আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসাব, অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভব হলে আয়ের নতুন উৎস তৈরি। তাহলে বেতন কম হলেও আর্থিক চাপ কিছুটা সামলানো সম্ভব।
১. প্রথম কাজ: কোথায় টাকা যাচ্ছে, তা খুঁজে বের করুন
অনেকেই জানেন মাসে কত টাকা বেতন পান, কিন্তু ঠিক কত টাকা কোথায় খরচ হয়, তার হিসাব রাখেন না। ফলে মাস শেষে টাকা না থাকার কারণও স্পষ্ট হয় না।
প্রথমে টানা ৩০ দিন প্রতিটি খরচ লিখে রাখুন। খাত হতে পারে—
- বাড়িভাড়া ও বাড়ির অন্যান্য খরচ
- বাজার ও খাবার
- বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও ইন্টারনেট
- যাতায়াত
- সন্তানের শিক্ষা
- চিকিৎসা ও ওষুধ
- ঋণের কিস্তি
- মোবাইল ও অন্যান্য বিল
- ব্যক্তিগত কেনাকাটা ও বিনোদন
- আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচ
খরচের পরিমাণ ছোট হলেও লিখুন। প্রতিদিনের ৫০ বা ১০০ টাকার খরচ মাস শেষে বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে। হিসাবের জন্য খাতা, মোবাইলের নোট অ্যাপ কিংবা সাধারণ স্প্রেডশিট ব্যবহার করা যায়।
কেন জরুরি: হিসাব না থাকলে মানুষ সাধারণত বড় খরচ মনে রাখে, কিন্তু ছোট ছোট ব্যয়ের যোগফল বুঝতে পারে না।
২. বেতন পাওয়ার দিনই মাসের বাজেট তৈরি করুন
বেতন পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা ভাগ করে রাখুন। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা যাবে, তা আগেই ঠিক করুন।
আয় ৩০ হাজার টাকা হলেও যদি অপরিহার্য খরচ ৩২ হাজার টাকা হয়, তাহলে জোর করে সঞ্চয়ের টাকা নির্ধারণ করবেন না। প্রথমে ঘাটতির কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
৩. প্রয়োজন আর ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য করুন
সব খরচ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো খরচ জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য, কোনোটি প্রয়োজনীয় হলেও কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়, আবার কিছু খরচ পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব।
খরচকে তিন ভাগে ভাগ করুন—
অপরিহার্য: খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, সন্তানের শিক্ষা, প্রয়োজনীয় বিল।
গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য: পোশাক, ঘরের সরঞ্জাম, বাইরে খাওয়া, উপহার, বিনোদন।
সাময়িকভাবে বাদ দেওয়া যায়: অপ্রয়োজনীয় অনলাইন কেনাকাটা, অব্যবহৃত সাবস্ক্রিপশন, ঘন ঘন রেস্টুরেন্টে খাওয়া, সামর্থ্যের বাইরে শখের পণ্য কেনা।
তবে সাশ্রয়ের নামে প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা বা সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অবহেলা করলে তার আর্থিক ক্ষতিও বড় হতে পারে।
৪. বাজারের খরচ কমাতে পরিকল্পনা করে কেনাকাটা করুন
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের বড় ব্যয়ের একটি অংশ খাবার ও বাজারে চলে যায়। তাই বাজারের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা জরুরি।
- সপ্তাহের খাবারের একটি তালিকা তৈরি করুন।
- বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা লিখুন।
- ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাজার করতে যাবেন না।
- একই পণ্যের একাধিক দোকানের দাম তুলনা করুন।
- মৌসুমি সবজি, ফল ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
- বেশি পরিমাণে কিনে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকলে তা এড়িয়ে চলুন।
- রান্না করা খাবার অপচয় না করে নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করুন।
- অপ্রয়োজনীয় প্যাকেটজাত খাবার ও কোমল পানীয় কেনা কমান।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সস্তা হলেই কোনো পণ্য ভালো বা পুষ্টিকর হবে না। খাবারের ক্ষেত্রে দাম ও পুষ্টিমান—দুটিই বিবেচনায় রাখতে হবে।
৫. ছোট খরচের হিসাব রাখুন
প্রতিদিনের ছোট ছোট খরচ অনেক সময় বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। যেমন—
- প্রতিদিন বাইরে চা-নাশতা
- প্রয়োজন ছাড়া রাইড শেয়ারিং
- ঘন ঘন খাবার অর্ডার
- মোবাইলের অতিরিক্ত ডেটা প্যাক
- ব্যবহার না করেও বিভিন্ন ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশনের বিল
- অপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো কেনাকাটা
ধরা যাক, প্রতিদিন ১০০ টাকা অপ্রয়োজনীয় খরচ হচ্ছে। মাসে তা ৩ হাজার টাকা। বছরে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে জরুরি চিকিৎসা, শিক্ষা বা ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করা সম্ভব।
অবশ্য সব ছোট খরচ বাদ দিতে হবে এমন নয়। বরং কোন খরচ থেকে বাস্তবে উপকার পাওয়া যাচ্ছে না, সেটি চিহ্নিত করুন।
৬. ঋণ থাকলে আগে সুদের হিসাব বুঝুন
বেতন কম এবং খরচ বেশি হলে অনেকেই পরিচিতজন, দোকান, সমিতি, ক্রেডিট কার্ড বা বিভিন্ন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। কিন্তু ঋণের সুদ ও কিস্তি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে পরবর্তী মাসের আয়ও আগের ঋণ পরিশোধে চলে যায়।
ঋণ থাকলে একটি তালিকা তৈরি করুন—
- ঋণের বিবরণ
- কত বাকি
- সুদ/অতিরিক্ত খরচ
- মাসিক কিস্তি
- ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ
- সমিতি বা ক্ষুদ্রঋণ
- পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার
প্রথমে সব ঋণের ন্যূনতম বা নির্ধারিত কিস্তি সময়মতো দেওয়ার চেষ্টা করুন। এরপর যে ঋণের সুদ বা অতিরিক্ত খরচ সবচেয়ে বেশি, সেটি দ্রুত কমানোর পরিকল্পনা করুন। এতে দীর্ঘমেয়াদে সুদের চাপ কমতে পারে।
তবে একটি ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আরেকটি বেশি সুদের ঋণ নেওয়া বিপজ্জনক। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে কিস্তি, সুদ, ফি এবং মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ বুঝে নিন। ঋণের শর্ত অস্পষ্ট হলে চুক্তি না করে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নিন।
৭. জরুরি তহবিল গড়ুন—অল্প টাকা দিয়েই শুরু করুন
হঠাৎ অসুস্থতা, চাকরি চলে যাওয়া, বাড়ির জরুরি মেরামত কিংবা পরিবারের কোনো বিপদ—এসব পরিস্থিতিতে আলাদা সঞ্চয় না থাকলে মানুষ ঋণ নিতে বাধ্য হয়।
তাই আয় কম হলেও জরুরি তহবিল গড়ার চেষ্টা করুন। শুরুতে মাসে ২০০, ৫০০ বা ১ হাজার টাকা আলাদা করে রাখতে পারেন। পরিমাণ ছোট হলেও নিয়মিত জমা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম লক্ষ্য হতে পারে অন্তত এক মাসের অপরিহার্য খরচের সমপরিমাণ অর্থ জমানো। পরে ধীরে ধীরে তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় খরচের সমপরিমাণ তহবিল গড়ার চেষ্টা করা যায়। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য; আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারের পক্ষে একবারে তা অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
জরুরি তহবিল এমন জায়গায় রাখুন, যেখান থেকে প্রয়োজনের সময় সহজে পাওয়া যায় এবং অযথা খরচ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
৮. আয় বাড়ানোর বিকল্প খুঁজুন
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, আয় প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে শুধু খরচ কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো পরিবারের আয় যদি ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চেয়েও কম হয়, তাহলে আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা জরুরি।
- নিজের দক্ষতা ও সময় বিবেচনা করে কিছু বিকল্প হতে পারে—
- অবসর সময়ে টিউশনি বা প্রশিক্ষণ দেওয়া
- লেখালেখি, অনুবাদ, গ্রাফিক ডিজাইন বা ভিডিও সম্পাদনার কাজ
- অনলাইনভিত্তিক বৈধ ফ্রিল্যান্সিং
- সেলাই, রান্না, হস্তশিল্প বা ঘরোয়া পণ্য তৈরি
- ছোট পরিসরে অনলাইন ব্যবসা
- কৃষি, পশুপালন বা পারিবারিক উৎপাদনমূলক উদ্যোগ
- কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন করে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির চেষ্টা
তবে অতিরিক্ত আয়ের আশায় প্রতারণামূলক অনলাইন কাজ, আগাম টাকা চাওয়া চাকরি, অস্বাভাবিক মুনাফার বিনিয়োগ কিংবা অবৈধ লেনদেনের ফাঁদে পড়বেন না। কোনো কাজ শুরু করার আগে তার প্রকৃতি, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, সম্ভাব্য আয় ও ঝুঁকি যাচাই করুন।
৯. বেতন বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করুন
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে আয় বাড়ানোর একটি সরাসরি পথ হলো বেতন পুনর্বিবেচনার আবেদন। তবে শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলার পরিবর্তে নিজের কাজের ফলাফল, দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য অবদান তুলে ধরা বেশি কার্যকর।
যেমন—
- গত এক বছরে কী কী দায়িত্ব বেড়েছে?
- প্রতিষ্ঠানের জন্য কী পরিমাপযোগ্য কাজ করেছেন?
- নতুন কোন দক্ষতা অর্জন করেছেন?
- একই ধরনের কাজের বাজারদর কত?
- বেতন বাড়ানো সম্ভব না হলে পরিবহন, খাবার, চিকিৎসা বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়া যায় কি না?
সম্ভব হলে লিখিতভাবে বা নির্ধারিত বৈঠকে বিষয়টি তুলুন। একই সঙ্গে বিকল্প চাকরির সুযোগও খুঁজে দেখতে পারেন। তবে বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আগে নতুন কাজের নিশ্চয়তা ও শর্ত যাচাই করা জরুরি।
১০. পরিবারের সবাইকে বাজেটের অংশ করুন
অনেক পরিবারে একজন আয় করেন, কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা মাসিক আয় ও ব্যয়ের প্রকৃত অবস্থা জানেন না। এতে প্রয়োজনের বাইরে খরচ হয়, আবার আর্থিক চাপও একা একজনকে বহন করতে হয়।
পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের নিয়ে মাসে অন্তত একবার বসুন। আলোচনা করুন—
- মাসে মোট আয় কত?
- অপরিহার্য খরচ কত?
- কোন খরচ কমানো সম্ভব?
- কোনো ঋণ আছে কি না?
- আগামী মাসে বড় কোনো ব্যয় আছে কি না?
- সঞ্চয় বা জরুরি তহবিলে কত রাখা যাবে?
সন্তানদের বয়স অনুযায়ী অর্থের মূল্য, সঞ্চয় এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়িয়ে চলার অভ্যাস শেখানোও উপকারী।
১১. ৫০-৩০-২০ নিয়ম সবার জন্য নয়
ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো—আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ ইচ্ছা বা জীবনযাপনের অন্যান্য খাতে এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা।
কিন্তু যাদের আয়ের বড় অংশই বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াতে চলে যায়, তাদের পক্ষে এই নিয়ম অনুসরণ করা কঠিন। তাই এটিকে বাধ্যতামূলক সূত্র হিসেবে না দেখে একটি সাধারণ ধারণা হিসেবে বিবেচনা করুন।
আপনার আয় যদি ২০ হাজার টাকা হয় এবং শুধু বাড়িভাড়া ও খাবারেই ১৫ হাজার টাকা লাগে, তাহলে ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের লক্ষ্য চাপ তৈরি করতে পারে। বরং প্রথমে মাসিক ঘাটতি বন্ধ করা, উচ্চ সুদের ঋণ কমানো এবং সামান্য জরুরি সঞ্চয় গড়ে তোলাই বেশি বাস্তবসম্মত।
১২. প্রতি সপ্তাহে ১৫ মিনিটের আর্থিক পর্যালোচনা করুন
বাজেট তৈরি করলেই হবে না, তা নিয়মিত পর্যালোচনাও করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে তিনটি প্রশ্নের উত্তর বের করুন—
১. এই সপ্তাহে কোন খাতে বেশি খরচ হয়েছে?
২. আগামী সপ্তাহে কোন খরচ কমানো সম্ভব?
৩. মাসের বাকি দিনগুলোতে হাতে থাকা টাকা দিয়ে প্রয়োজন মেটানো যাবে কি না?
এভাবে আগেই সমস্যা বুঝতে পারলে মাসের শেষ দিকে ধার করার প্রয়োজন কমতে পারে।
৩০ দিনের একটি বাস্তব পরিকল্পনা
- প্রথম সপ্তাহ: হিসাব পরিষ্কার করুন
- পরিবারের মোট আয় লিখুন।
- গত মাসের খরচের তালিকা তৈরি করুন।
- সব ঋণ ও কিস্তির হিসাব বের করুন।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করুন।
- দ্বিতীয় সপ্তাহ: বাজেট কার্যকর করুন
- বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াতের টাকা আলাদা রাখুন।
- বাজারের তালিকা তৈরি করুন।
- অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন ও কেনাকাটা বন্ধ করুন।
- পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাজেট নিয়ে আলোচনা করুন।
- তৃতীয় সপ্তাহ: ঋণ ও সঞ্চয়ের পরিকল্পনা
- ঋণের সুদ ও কিস্তির হিসাব পর্যালোচনা করুন।
- উচ্চ সুদের ঋণ কমানোর পরিকল্পনা করুন।
- সামর্থ্য অনুযায়ী জরুরি তহবিলে টাকা রাখুন।
- চতুর্থ সপ্তাহ: আয়ের নতুন সুযোগ
- নিজের দক্ষতা ও সময়ের তালিকা তৈরি করুন।
- অতিরিক্ত আয়ের বাস্তবসম্মত একটি পথ বেছে নিন।
- কর্মক্ষেত্রে বেতন বা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর সম্ভাবনা যাচাই করুন।
- পরবর্তী মাসের বাজেট তৈরি করুন।
শুধু সাশ্রয় নয়, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য জরুরি
বেতন কম হলে সংসার চালানোর চাপ যে কতটা কঠিন, তা কেবল বাজেটের সূত্র দিয়ে বোঝানো যায় না। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে অনেক পরিবারের হাতে সঞ্চয়ের মতো অর্থ থাকে না। বিবিএসের সাম্প্রতিক জরিপে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান এবং ঋণগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা সেই বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।
তাই বেতন কম, খরচ বেশি হলে প্রথমে নিজের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত হিসাব বের করতে হবে। এরপর অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণ, পরিবারের সহযোগিতা এবং আয়ের নতুন সুযোগ তৈরির দিকে এগোতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিসর্জন দিয়ে সঞ্চয় করার চেষ্টা করা যাবে না। আর্থিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য কেবল টাকা জমা করা নয়; বরং বর্তমানের প্রয়োজন মিটিয়ে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করা।