যেভাবে যুদ্ধ থামিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে আলোচনায় রাজি করালো পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের টান টান উত্তেজনার মধ্যে হঠাৎ করেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, আর এর পেছনে উঠে এসেছে এক অপ্রত্যাশিত নাম, পাকিস্তান। কূটনৈতিক অঙ্গনে ইসলামাবাদ নিজেকে কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছে, যা একদিকে প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন প্রশ্ন।

বার্তাসংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী আলোচনার মঞ্চ তৈরি করতে গিয়ে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে। বুধবার (৮ এপ্রিল) দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ দাবি করেন, তার সরকারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা ‘সব জায়গায়’ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তার ভাষায়, যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যেই কার্যকর, আর এবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ-এ শুরু হবে সরাসরি আলোচনা।

এই ঘটনাকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরাও। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান মন্তব্য করেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি পাকিস্তানের অন্যতম বড় কূটনৈতিক অর্জন। তার মতে, এই সাফল্য সংশয়বাদীদের ভুল প্রমাণ করেছে, যারা মনে করতেন এত জটিল ও উচ্চঝুঁকির মধ্যস্থতায় পাকিস্তান সফল হতে পারবে না।

পাকিস্তানের এই ভূমিকার পেছনে রয়েছে তার জটিল কিন্তু কার্যকর সম্পর্কের জাল। তেহরানে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, এই অঞ্চলে খুব কম দেশই আছে, যাদের সঙ্গে একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই পক্ষেরই কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে; পাকিস্তান সেই বিরল ব্যতিক্রম।

ঐতিহাসিকভাবেও এই সম্পর্কের ভিত্তি গভীর। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ইরানই প্রথম পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়। আবার ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর পাকিস্তানও ইরানকে স্বীকৃতি জানায়। দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংযোগ সব মিলিয়ে সম্পর্কের একটি স্বতন্ত্র মাত্রা তৈরি করেছে। এমনকি ওয়াশিংটনে যেখানে তেহরানের দূতাবাস নেই, সেখানে পাকিস্তানই ইরানের কিছু কূটনৈতিক স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও ব্যক্তিগত ও কৌশলগত সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনির এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দুই দেশের যোগাযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অতীতে কাশ্মীর ইস্যুতে উত্তেজনার সময়ও এই যোগাযোগ সক্রিয় ছিল।

তবে এই সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ৯/১১-পরবর্তী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে পাকিস্তানের মাটিতে ওসামা বিন লাদেন-কে হত্যা করার মার্কিন অভিযান যা ইসলামাবাদকে না জানিয়েই চালানো হয় দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধাক্কা দেয়।

আঞ্চলিক কূটনীতিতেও পাকিস্তান একাধিক ভারসাম্য রক্ষা করছে। ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন সম্পর্ককে মজবুত করেছে, তেমনি ইরানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীন-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক পরিসর বাড়িয়েছে। ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে আলোচনায় আনতে চীন ভূমিকা রাখতে পারে।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং পরে বেইজিং সফর করেছেন। চীন, যা ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে সংঘাত নিরসনে উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইসলামাবাদের ‘বিশেষ ভূমিকা’র কথাও উল্লেখ করেছে।

পাকিস্তানের এই সক্রিয়তার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় কারণ। দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল, যা আর্থিক সংকটে থাকা সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করত।

তবে সবকিছু এত সরল নয়। যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়েও দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি। পাকিস্তানের দাবি, লেবাননসহ সব জায়গায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। কিন্তু ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা এই চুক্তিকে সমর্থন করলেও লেবানন এতে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সেখানে তারা ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে।