ঢাকার বাজারের সয়াবিন তেলে বিষাক্ত ধাতু!

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৪ এএম

রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সয়াবিন তেলে সিসা, আর্সেনিক, নিকেল, পারদ ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতু ও মৌলের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। ঢাকার চারটি বড় পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২১টি সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর ২০টিতে সিসার মাত্রা আন্তর্জাতিক নির্দেশক সীমার চেয়ে বেশি। সব নমুনায় আর্সেনিকের মাত্রাও নির্ধারিত তুলনামূলক সীমা ছাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ ৮ অক্টোবর অনলাইনে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটির শিরোনাম Dietary Exposure to Toxic Trace Elements through Soybean Oil Consumption in Bangladesh and Associated Health Risks। গবেষণার তথ্য নিয়ে ১২ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দৈনিক যুগান্তর।

সিসার মাত্রা প্রায় ১৯ গুণ পর্যন্ত বেশি

গবেষণায় সয়াবিন তেলের প্রতি কেজিতে সিসার ঘনত্ব পাওয়া গেছে ০.০৪৮ থেকে ১.৫২৯ মিলিগ্রাম। খাদ্যতেলে সিসার জন্য গবেষকেরা প্রতি কেজিতে ০.০৮ মিলিগ্রামের আন্তর্জাতিক কোডেক্স নির্দেশককে তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সেই হিসাবে ২১টি নমুনার মধ্যে ২০টিতে সিসার মাত্রা ওই সীমার ওপরে এবং সর্বোচ্চ মাত্রাটি প্রায় ১৯ গুণ বেশি।

গবেষকদের মতে, সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্নায়বিক সক্ষমতার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। 

সব নমুনায় আর্সেনিক, অধিকাংশে নিকেল

পরীক্ষায় প্রতি কেজি সয়াবিন তেলে আর্সেনিকের পরিমাণ পাওয়া গেছে ০.১৫৫ থেকে ০.২৭৬ মিলিগ্রাম। তুলনার জন্য ব্যবহৃত প্রতি কেজিতে ০.১ মিলিগ্রামের নির্দেশক সীমা ২১টি নমুনার সবকটিতেই অতিক্রম করেছে।

নিকেলের ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ০.০২৪ থেকে ২.৩৬৮ মিলিগ্রাম। গবেষণায় ব্যবহৃত প্রতি কেজিতে ০.১ মিলিগ্রামের তুলনামূলক সীমা অধিকাংশ নমুনায় ছাড়িয়েছে; সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল ওই সীমার প্রায় ২৩ গুণ। তামার ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ০.১০৭ থেকে ০.৮০৬ মিলিগ্রাম, যা কয়েকটি নমুনায় ব্যবহৃত তুলনামূলক সীমার ওপরে।

গবেষণায় ক্যাডমিয়ামের মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি কেজিতে ০.০০৪ থেকে ০.০২৬ মিলিগ্রাম—গবেষকেরা যে ০.০৫ মিলিগ্রাম সীমা ব্যবহার করেছেন, তার নিচে। অন্যদিকে, পারদের মাত্রা ছিল প্রতি কেজিতে ০.১২২ থেকে ০.২৬৪ মিলিগ্রাম। ভোজ্যতেলে পারদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সীমা না থাকায় গবেষকেরা এ ফলাফলের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।

বোতলজাত ও খোলা—দুই ধরনের তেলই পরীক্ষায়

গবেষণায় ঢাকার চারটি বড় পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করা ২১টি বাণিজ্যিক সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি ছিল ব্র্যান্ডের বোতলজাত তেল এবং ১৫টি ছিল খোলা বা মূল প্রস্তুতকারকের পরিচয়বিহীন তেল।

গবেষকেরা উন্নত ইনডাক্টিভলি কাপলড প্লাজমা মাস স্পেকট্রোমেট্রি (ICP-MS) পদ্ধতিতে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল ও তামাসহ আটটি মৌলের উপস্থিতি ও ঘনত্ব পরিমাপ করেন। 

তবে নমুনার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এই ফলাফল দিয়ে ঢাকার বাজারের সব ব্র্যান্ড বা সব খোলা সয়াবিন তেলের অবস্থা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। কোন ব্র্যান্ডের তেলে কতটা দূষণ পাওয়া গেছে, তা যাচাই করতে আরও বিস্তৃত নমুনাভিত্তিক পরীক্ষা প্রয়োজন।

নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পরীক্ষার সুপারিশ

গবেষকেরা বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলের নিয়মিত ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, বোতলজাত ও খোলা—উভয় ধরনের তেলের আরও বেশি নমুনা সংগ্রহ এবং মাননিয়ন্ত্রণ জোরদার করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের কোন পর্যায়ে দূষণ ঘটছে, তা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য আমদানি পরীক্ষার তথ্যভান্ডারেও সুরক্ষিত ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ সয়াবিন তেলের জন্য সিসা ও আর্সেনিকসহ বিভিন্ন উপাদানের পরীক্ষার শর্ত উল্লেখ রয়েছে। 

গবেষকেরা ক্রোমিয়ামের ক্ষেত্রেও সতর্কতার কথা বলেছেন। পরীক্ষায় মোট ক্রোমিয়ামের পরিমাণ মাপা হয়েছে; এর মধ্যে তুলনামূলক বেশি বিষাক্ত ক্রোমিয়াম-৬ এবং কম বিষাক্ত ক্রোমিয়াম-৩ আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই শুধু মোট ক্রোমিয়ামের মাত্রা দিয়ে বিষাক্ততার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

গবেষণাটি সয়াবিন তেলে দূষণের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্কসংকেত দিলেও, এই তেল খাওয়ার কারণে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়েছেন—এমন প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়নি। জনস্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণে দূষণের মাত্রার পাশাপাশি দৈনিক তেল গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে শরীরে প্রবেশ করা ধাতুর মোট পরিমাণ বিবেচনা করা জরুরি।

সূত্র: Journal of Food Composition and Analysis—গবেষণার শিরোনাম ও প্রকাশনা-তথ্য; দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন; বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষার তথ্যভান্ডার।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত