খোলস বদলেছে, নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি! 

গাজীপুরের ঝুট সাম্রাজ্যে নতুন মোড়কে সক্রিয় পুরোনো সিন্ডিকেট

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৯ এএম

সরকার পরিবর্তনের পর দৃশ্যপটে বদল এলেও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শতকোটি টাকার ঝুট (গার্মেন্টস বর্জ্য) ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা কমেনি। 

স্থানীয় বিএনপির একাংশের দাবি, মাঠপর্যায়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা হলেও পর্দার আড়াল থেকে এখনো কলকাঠি নাড়ছে বিগত আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। 

গোপন সমঝোতা ও খোলস বদলানোর এই খেলায় ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, যার জেরে শিল্প এলাকায় বাড়ছে মামলা, হামলা ও রাজনৈতিক কোন্দল।

সম্প্রতি টঙ্গী বিসিক এলাকায় মোটরসাইকেল মহড়া নিয়ে মামলা এবং এক তাঁতীদল নেতার গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

টঙ্গীর মহড়া ও চাঁদাবাজির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলে অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদা দাবির অভিযোগে সম্প্রতি একটি মামলা দায়ের হয়। মামলার বাদী মো. নুরুজ্জামান এজাহারে উল্লেখ করেন, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে একদল লোক আগ্নেয়াস্ত্রসহ মহড়া দেয় এবং বিভিন্ন কারখানায় ঝুট কেনাবেচায় বাধা সৃষ্টি করে।

তবে এই মামলাকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো' বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। 

গত শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মদিনাবাজারে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে তারা ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. কামাল হোসেন বুলুসহ যুবদল ও শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। 

তাদের দাবি, একটি পুরোনো কিশোর গ্যাংয়ের ভিডিওর সাথে এই ঘটনাকে মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মামলার বাদী নুরুজ্জামান নিজেই অতীতে স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের সহযোগী হিসেবে ঝুট ব্যবসা করতেন। এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশের সাথে হাত মিলিয়ে তিনি পুরোনো সিন্ডিকেটের স্বার্থই রক্ষা করছেন।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের নেপথ্যেও কি ঝুট ব্যবসা?

অনুরূপ আরেকটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তৃণমূল নেতারা জানান, টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতীদলের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন খোকনকে একটি পারিবারিক বিরোধের জেরে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তকমা দিয়ে গ্রেফতার ও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। 

তাদের দাবি, এলাকায় জমি ও ঝুট ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারে বাধা হওয়াতেই খোকনকে সুপরিকল্পিতভাবে ফাঁসান হয়েছে।

রাজপথের ত্যাগী বনাম গোপন সমঝোতাকারী

গাজীপুরের গাছা ও বাসন এলাকাতেও ইতিপূর্বে ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

তৃণমূল বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য, বিগত দিনে যারা রাজপথে আন্দোলনে ছিলেন না, এমন একটি সুবিধাবাদী অংশ এখন বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। আর্থিক সুবিধা ও গোপন সমঝোতার মাধ্যমে এই 'যৌথ সিন্ডিকেট' গড়ে উঠেছে, যার কারণে ত্যাগী কর্মীরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন।

তৃণমূলের দাবি, কোন কারখানায় কারা ঝুট ব্যবসা পরিচালনা করছে, কার সাথে চুক্তি হচ্ছে এবং কারা মালামাল নিচ্ছে—তার একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতামত

শিল্প ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসা বরাবরই বিপুল অর্থ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান উৎস। 

ফলে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এই বিশাল অর্থনৈতিক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন করে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে শিল্পাঞ্চলের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

HN
আরও পড়ুন