ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের সরু রাস্তা ধরে মোটরসাইকেল ছুটে চলছে ধানক্ষেতের দিকে। পেছনে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন উদ্বিগ্ন কৃষক। তাদের জমিতে দেখা দিয়েছে রোগ। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে পুরো ফসল।
এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে কৃষকদের আস্থার নাম মফিজ উদ্দিন। এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারালেও থেমে যাননি তিনি। বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের হাজারো কৃষকের কাছে হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার প্রতীক।
সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনে অনীহা কিংবা অজুহাতের অভিযোগ যখন প্রায়ই শোনা যায়, তখন মাঠে-মাঠে কৃষি সেবা পৌঁছে দিয়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন।
কৃষকের সমস্যা মানেই তার নিজের দায়িত্ব :
হলিধানী ব্লকে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষক রয়েছেন। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও মসলাজাতীয় ফসল চাষ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব কৃষকের জন্য সরকারি কৃষি সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছেন মফিজ উদ্দিন। তবে তার কাছে এ দায়িত্ব কেবল চাকরির অংশ নয়Ñএটি এক মানবিক অঙ্গীকার। কোনো কৃষকের জমিতে রোগ দেখা দিলে, ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার প্রয়োজন হলে সবার আগে যে মানুষটির কথা মনে পড়ে, তিনি মফিজ উদ্দিন। ছুটির দিন হোক বা গভীর রাতÑকৃষকের ফোন পেলেই ছুটে যান মাঠে। স্থানীয়দের ভাষায়, তার প্রকৃত অফিস কোনো দালানকোঠা নয় তার অফিস কৃষকের ক্ষেত।
সংগ্রামের শুরু জীবন থেকেই :
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের সন্তান মফিজ উদ্দিন। বাবা মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দার। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা মফিজ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত।
শিক্ষাজীবনে ঝিনাইদহ থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পাস করার পর ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার সম্পন্ন করেন। পরে যশোরের কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (এগ্রিকালচার) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ভয়াবহ দুর্ঘটনা বদলে দেয় জীবন :
২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাপায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার ডান হাত। মুহূর্তেই থেমে যায় স্বাভাবিক জীবনচক্র। হাসপাতালে শুয়ে থাকা দিনগুলোতে ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু মফিজ উদ্দিন হার মানেননি। দীর্ঘ চিকিৎসা, শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক চাপকে সঙ্গী করেই তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেন। নিজের সীমাবদ্ধতাকে বাধা হিসেবে না দেখে সেটিকে শক্তিতে রূপান্তর করেন। ধীরে ধীরে শিখে নেন এক হাত দিয়েই জীবন ও কর্মক্ষেত্র সামলানোর কৌশল।
ইচ্ছাশক্তিই তার শক্তি :
অদম্য মনোবলের ফলেই ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন তিনি। কর্মজীবনের শুরু যশোরে। পরে বরিশাল ও ফরিদপুরে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকে যোগদান করেন। এরপর থেকেই মাঠমুখী কার্যক্রম, কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানের কারণে অল্প সময়েই কৃষকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি।
কৃষকদের চোখে একজন ভরসার মানুষ :
হলিধানী গ্রামের কৃষক আলা উদ্দিন বলেন, ধানের জমিতে রোগ হলে আগে খুব চিন্তায় পড়তাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। জমিতে নেমে রোগ শনাক্ত করে কী ওষুধ দিতে হবে বলে দেন। এক হাত না থাকলেও তাকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি।
কৃষাণী আছমা বেগম বলেন, সবজি চাষে রোগবালাই হলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। স্যার নিজে এসে দেখে পরামর্শ দেন। তার কারণে অনেক ক্ষতি থেকে বেঁচেছি।
কৃষক হাফিজুর রহমান বলেন, এক হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি যেভাবে মাঠে মাঠে ঘুরে কৃষকদের সেবা দেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
কৃষকের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার :
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি হয়তো আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পুরস্কার বা সম্মাননা নয়, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো কৃষকের মুখের হাসি। কোনো কৃষকের ক্ষতি কমলে বা ভালো ফলন হলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।’
প্রশাসনের প্রশংসা :
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর-এ-নবী বলেন, ‘মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, একটি হাত হারিয়ে অনেকেই থেমে যান। কিন্তু মফিজ উদ্দিন প্রমাণ করেছেন, মানুষের শক্তি তার হাতে নয়, তার মনোবলে।
খুলনায় ফজরের নামাজের সময় মসজিদে সন্ত্রাসীদের গুলি, আহত ২
শিবিরের বিরুদ্ধে রাঙামাটিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
স্থায়ী জামিন পেলেন এমপি আমির হামজা