জোড়া লাগানো দুই শিশুর চিকিৎসা অনিশ্চিত, আর্থিক সংকটে পরিবার

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

একটি শরীর, দুটি ছোট্ট মুখ। একই বুক, একই পেট কিন্তু দুটি আলাদা হৃদস্পন্দন, দুটি আলাদা প্রাণ। একজন ঘুম ভাঙলে অন্যজনও জেগে ওঠে, একজন কাঁদলে অন্যজনও কান্নায় ভেঙে পড়ে। একজনের সামান্য নড়াচড়ায় অন্যজনের শরীরেও লাগে টান। জন্মের পর থেকেই এভাবেই একই শরীরে বন্দি হয়ে পৃথিবীকে চিনছে তিন মাস বয়সী যমজ কন্যাশিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুম। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধা এখন অর্থের অভাব। প্রতিদিনের দুধ, ওষুধ আর চিকিৎসার খরচ জোগাতেই যখন পরিবারটি হিমশিম খাচ্ছে, তখন কোটি টাকার মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসার স্বপ্ন যেন তাদের কাছে অধরাই হয়ে উঠেছে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া গ্রামের বাসিন্দা নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় শিশু দুটির। জন্মের পর থেকেই চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে তারা। বর্তমানে তাদের বয়স প্রায় তিন মাস।

শিশু দুটির বাবা নাহিদ হাসানের জীবনও যেন এখন সংগ্রামের আরেক নাম। একসময় রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সংসারের ভালো ভবিষ্যতের আশায় ঢাকায় চাকরি করলেও সন্তানদের জন্মের পর বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে আসেন। এখন কুষ্টিয়া শহরের একটি ছোট দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। মাস শেষে হাতে পান মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। সেই টাকায় কোনো রকমে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর শিশু দুটির জন্য দুধ, ডায়াপার, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে ধারদেনাও করতে হয়েছে।

মায়ের কোলে জোড়া লাগানো শিশু জয়নব ও উম্মে কুলসুম

নাহিদ হাসান বলেন, ‘বাবা হওয়ার আনন্দটা ঠিকমতো উপভোগই করতে পারলাম না। সারাক্ষণ মেয়েদের চিকিৎসার চিন্তা মাথায় ঘোরে। ডাক্তাররা বলেছেন, সময়মতো চিকিৎসা করাতে পারলে ওদের আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য আমার নেই। এখন ওদের দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকের কাছ থেকে ধার করে কোনোভাবে দিন পার করছি।’

সম্প্রতি প্রতিবেদনটি তৈরীর জন্য সরেজমিনে বিলগাথুয়া গ্রামে গিয়ে নাহিদ হাসান ও সানজিদা আক্তার দম্পতির প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে,  প্রতিটি দিনই যেন তারা নতুন কোন উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছেন। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা শুধু একটি স্বপ্নই দেখেন একদিন জয়নব ও উম্মে কুলসুম আলাদা দুটি সুস্থ শরীর ও অন্য সব শিশুর মতো স্বাভাবিক জীবন পাবে। 

প্রতিবেশীরা জানায়, শিশু দুই জনের এখন প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, আর সেই চিকিৎসার পথ খুলে দিতে প্রয়োজন মানবিক সহায়তার হাত। সমাজের বিত্তবান মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাষ্ট্রের সহযোগিতা পেলে এই দুই নিষ্পাপ শিশুর হয়তো ফিরে পাবে নতুন জীবন। 

শিশু দুটির মা সানজিদা আক্তারের দিন কাটে দুই মেয়েকে বুকের সঙ্গে আগলে রেখে। অন্য মায়েরা যেমন এক সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করেন, তিনি তেমন সুযোগও পান না। দুই শিশুকে একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে তাকে ভয় আর দুশ্চিন্তা তাড়া করে।

চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ওদের আলাদা করে কোলে নেওয়া যায় না। একজন একটু নড়লেই অন্যজনও কষ্ট পায়। কখনো একজন ঘুমাতে চাইলে অন্যজনের নড়াচড়ায় ঘুম ভেঙে যায়। ঢাকায় নিয়মিত চিকিৎসার জন্য যেতে হবে, কিন্তু যাতায়াত আর পরীক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। মা হয়ে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, কিছুই করতে পারি না।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, জয়নব ও উম্মে কুলসুমকে আলাদা করতে হলে আরও সময় লাগবে। এর আগে তাদের শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কতটা সংযুক্ত, তা নিশ্চিত হতে একাধিক আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি হবে। জন্মের তিন মাস পর পুনরায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যেতে বলেছিলেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু অর্থাভাবে সেই যাত্রাই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান (তুহিন) বলেন, শিশু দুটির চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা গেলে সফল অস্ত্রোপচারের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। তাই চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হবে। পরিবারটির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। চিকিৎসার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান, উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিশু দুটির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

MCH
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত