জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা, আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ, মারণাস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা, উসকানিমূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততা এবং কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। পরদিন গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তিনি নির্দেশ, প্ররোচনা ও সহায়তা করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রস্তুত, আটক ও নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়া, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করে, শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনুর ফোনালাপের ট্রান্সক্রিপ্ট ও বিশেষজ্ঞ মতামত ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ‘জঙ্গি নাটকের কার্ড’ ব্যবহার এবং ৫ আগস্ট ঢাকায় লোকসমাগম ঘটিয়ে বিরোধী পক্ষকে দমন করার পরিকল্পনার বিষয় উঠে আসে বলে প্রসিকিউশনের দাবি।
মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ১১ সেপ্টেম্বর। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
বিচার চলাকালে প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ২০ সিরিজের নথি ও পাঁচটি বস্তুগত আলামত উপস্থাপন করে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
বিচার চলাকালে হাসানুল হক ইনু নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য জমা দেন। তিনি অভিযোগগুলোকে ‘কাল্পনিক’, ‘বিদ্বেষপ্রসূত’ ও ‘বানোয়াট’ বলে উল্লেখ করেন এবং নিজেকে রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার বলেও দাবি করেন।
দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেন। সেই ধার্য দিনে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে হাসানুল হক ইনুকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন।