দেশের বিভিন্ন এলাকায় কবর থেকে মরদেহ ও মানবকঙ্কাল চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছে। পরে এসব মানবকঙ্কালের একটি অংশ পৌঁছে যাচ্ছে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের কাছে, এমনকি ব্যবহার হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ ও ব্যবহারিক শিক্ষায়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই অবৈধ বাণিজ্যে কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল সংগ্রহকারী পেশাদার ব্যক্তিদের পাশাপাশি কিছু মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজধানীতে উদ্ধার অর্ধশত কঙ্কাল
চলতি বছরের ৯ মার্চ রাজধানীতে প্রায় অর্ধশত মানবকঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় করা মামলার তদন্তে কবর থেকে মরদেহ ও কঙ্কাল সংগ্রহ, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা এবং পরে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন এলাকায় চক্রের সদস্যরা কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল সংগ্রহ করে তা একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে। এরপর নির্দিষ্ট ক্রেতাদের কাছে এসব কঙ্কাল বিক্রি করা হয়।
একাধিক ধাপে চলে অবৈধ কার্যক্রম
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মানবকঙ্কালের এই অবৈধ বেচাকেনায় একাধিক পক্ষ কাজ করে। প্রথমে কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়। এরপর সংগৃহীত হাড়গুলো প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ ও বিক্রির উপযোগী করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সেগুলো মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে বৈধ উৎস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া মানবদেহের অংশ সংগ্রহ ও বেচাকেনা নিয়ে গুরুতর আইনগত ও নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।
মেডিকেল শিক্ষায় কঙ্কালের চাহিদা
মেডিকেল শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অ্যানাটমি। এমবিবিএস কোর্সের প্রথম দিকের পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, হাড় ও বিভিন্ন কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নিতে হয়। ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও মানবকঙ্কাল ও হাড় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দেশে মেডিকেল শিক্ষার পরিধি বাড়ার সঙ্গে মানবকঙ্কালের চাহিদাও বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে ১০৮টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে আসন ৫ হাজার ১০০টি এবং ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ৬ হাজার ১টি। সব মিলিয়ে এমবিবিএস কোর্সে আসন ১১ হাজার ১০১টি।
এ ছাড়া দেশে ৩৫টি ডেন্টাল কলেজ ও ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ৯টি এবং বেসরকারি ২৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন ১ হাজার ৯৫০টি।
চাহিদা বাড়লেও বৈধ সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন
মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষায় মানবকঙ্কালের প্রয়োজন থাকলেও বৈধভাবে এসব শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবস্থা কতটা পর্যাপ্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পর্যাপ্ত বৈধ সরবরাহের ঘাটতি থাকলে অবৈধ বাজার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের হাতে মানবকঙ্কাল পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো শিক্ষার্থী বা প্রতিষ্ঠান যেন অবৈধ উৎস থেকে মানবদেহের অংশ সংগ্রহ না করে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
কবরের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
মানবকঙ্কালের অবৈধ বাণিজ্যের কারণে শুধু চিকিৎসাশিক্ষার নৈতিকতা নয়, কবরের নিরাপত্তা ও মৃত ব্যক্তির প্রতি সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। স্বজনের কবর থেকে মরদেহ বা কঙ্কাল চুরি যাওয়ার ঘটনা পরিবারগুলোর জন্য গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই কবর থেকে মরদেহ ও কঙ্কাল চুরি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত মানবকঙ্কালের উৎস যাচাই এবং বৈধ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
কবর থেকে কঙ্কাল চুরি করে তা যদি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে পৌঁছে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি অপরাধচক্রের বিষয় নয়—চিকিৎসাশিক্ষার নৈতিকতা, মৃতের মর্যাদা এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই এটি বড় সতর্কবার্তা।
সূত্র: জাগো নিউজ
মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থই অগ্রাধিকার: শামা ওবায়েদ
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও পাবেন নতুন বেতনকাঠামোর সুবিধা
ইইউ নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে: ইরান
ভারতে কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ১১