সন্তানকে আগলে রাখুন: নিখোঁজ ও অপহরণ ঠেকাতে অভিভাবকের করণীয়

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

সন্তানকে ঘিরে মা-বাবার সবচেয়ে বড় ভয়—হঠাৎ যদি সন্তানকে খুঁজে না পাওয়া যায়! কখনো খেলতে গিয়ে, কখনো স্কুল থেকে ফেরার পথে, আবার কখনো আত্মীয়ের বাড়ি বা কোনো জনাকীর্ণ স্থান থেকে শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর আসে। কিছু ঘটনায় অপহরণের অভিযোগ ওঠে, কোথাও আবার মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নিখোঁজের পর শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও পরিবার ও সমাজকে নাড়া দেয়।

বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যও বিষয়টির গুরুত্ব সামনে এনেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে; তবে ২ হাজার ৩৮ জন এখনো অনুত্রাসিত ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ অপরিচিত স্থানে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া; আর ১০–১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক চাপ, বন্ধুদের প্রভাবসহ নানা কারণ থাকতে পারে।

অর্থাৎ, প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবার শিশুকে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে হালকাভাবে দেখারও সুযোগ নেই। তাই প্রয়োজন সচেতনতা, শিশুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি।

শিশুকে একা ছেড়ে দেবেন না

ছোট শিশুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হলো—তাকে দায়িত্বশীল কোনো প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধানে রাখা। বাজার, মেলা, পার্ক, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন বা অন্য কোনো ভিড়ের জায়গায় শিশুকে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

অনেক সময় কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। ‘একটু পরেই আসছি’ বলে শিশুকে দোকান, গাড়ি কিংবা বাড়ির সামনে একা রেখে যাওয়া নিরাপদ পদ্ধতি নয়।

UNICEF-এর পরামর্শও হলো, শিশুর দেখভালের দায়িত্ব সবসময় একজন দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের হাতে থাকা নিশ্চিত করা এবং বাইরে গেলে শিশুকে কোথায় রাখা হবে, তা আগে থেকে পরিকল্পনা করা।

শিশুকে নিজের পরিচয় শেখান

যে শিশু নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, বাড়ির ঠিকানা এবং অন্তত একটি জরুরি ফোন নম্বর বলতে পারে, সে হারিয়ে গেলে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা বাড়ে।

ছোটবেলা থেকেই শিশুকে শেখাতে হবে—

নিজের পুরো নাম; বাবা-মায়ের নাম; বাড়ির ঠিকানা বা এলাকার নাম; অন্তত একজন অভিভাবকের মোবাইল নম্বর; প্রয়োজনে পুলিশের কাছে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে; হারিয়ে গেলে কোথায় দাঁড়াতে হবে এবং কাকে সাহায্যের জন্য বলতে হবে।

তবে শিশুকে মুখস্থ করানোর পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন করানো জরুরি। কয়েক মাস পরপর জিজ্ঞেস করে দেখা যেতে পারে, সে বাবা-মায়ের নাম ও ফোন নম্বর মনে রাখতে পারছে কি না।

‘অপরিচিত’ নয়, শেখান নিরাপদ-অনিরাপদ আচরণ

শিশুকে শুধু ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’ বললেই সবসময় যথেষ্ট নয়। কারণ বাস্তবে বিপদ কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে, আবার কখনো পরিচিত মানুষের মাধ্যমেও আসতে পারে।

তাই শিশুকে শেখাতে হবে—কেউ যদি তাকে জোর করে কোথাও নিয়ে যেতে চায়, ভয় দেখায়, গোপন কোনো কথা বলতে বলে, উপহার বা টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করে কিংবা বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই কোথাও যেতে বলে, তাহলে সে যেন সঙ্গে সঙ্গে ‘না’ বলে এবং নিরাপদ কোনো বড় মানুষের কাছে যায়।

শিশুকে এটাও বোঝাতে হবে, কোনো বড় মানুষ তার সঙ্গে এমন আচরণ করলে সেটি তার দোষ নয়। ভয় বা লজ্জার কারণে বিষয়টি গোপন না করে বাবা-মাকে জানাতে হবে।

শিশুর কথা বিশ্বাস করুন

সন্তান যদি বলে—‘ওই জায়গায় যেতে আমার ভয় লাগে’, ‘ওই ব্যক্তি আমাকে বিরক্ত করে’ কিংবা ‘কেউ আমাকে অনুসরণ করছে’—তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা যাবে না।

UNICEF অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছে, শিশু নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করলে সেটিকে গুরুত্ব দিতে এবং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে।

অনেক পরিবারে শিশুর কথা ‘বাচ্চাদের কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এই অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। শিশুর কথা শুনে প্রয়োজন হলে শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ, পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।

স্কুলে যাওয়া-আসার নিরাপত্তা

স্কুলে যাওয়া ও ফেরার সময় শিশু কোথায় আছে, তা অভিভাবকদের জানা উচিত। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে অভিভাবক, পরিবারের সদস্য বা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক কারও সঙ্গে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা ভালো।

স্কুল থেকে কে সন্তানকে নিয়ে যাবে, সে বিষয়ে স্কুলের সঙ্গে স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। অপরিচিত কেউ এসে ‘তোমার বাবা-মা আমাকে পাঠিয়েছে’ বললেই যেন শিশু তার সঙ্গে না যায়—এ বিষয়ে আগে থেকেই তাকে শেখাতে হবে।

প্রয়োজনে পরিবারের একটি গোপন সংকেত বা কোডওয়ার্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। অভিভাবক সত্যিই কাউকে পাঠালে সেই ব্যক্তি নির্ধারিত সংকেতটি জানবে। এতে শিশুকে ভুল পরিচয়ে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।

অনলাইনেও নজর রাখুন

বর্তমানে শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু রাস্তা বা স্কুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, মেসেজিং অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও অপরিচিত ব্যক্তি শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

অভিভাবকদের তাই জানতে হবে—সন্তান কার সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছে, কী ধরনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে এবং ব্যক্তিগত তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করছে কি না।

শিশুকে শেখাতে হবে, নিজের বাসার ঠিকানা, স্কুলের নাম, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, পরিবারের আর্থিক তথ্য বা ব্যক্তিগত ছবি অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।

ছবি ও পরিচয় সংরক্ষণ করুন

প্রতিটি পরিবারের উচিত সন্তানের সাম্প্রতিক একটি ছবি নিরাপদে রাখা। পাশাপাশি শিশুর বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, বিশেষ কোনো শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য এবং নিয়মিত ব্যবহৃত পোশাকের তথ্য অভিভাবকদের জানা থাকা ভালো।

এগুলো নিখোঁজ হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ ও উদ্ধারকারী সংস্থাকে দ্রুত তথ্য দিতে কাজে আসতে পারে।

সন্তান নিখোঁজ হলে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা নয়

সন্তানকে খুঁজে না পাওয়া গেলে ‘কিছুক্ষণ পর হয়তো ফিরে আসবে’ ভেবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা ঠিক নয়। প্রথম মুহূর্ত থেকেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রথমে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, প্রতিবেশী ও শিশুর পরিচিত জায়গাগুলোতে খোঁজ করুন। একই সঙ্গে দ্রুত স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিন।

বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি ব্যবস্থাতেও হারানো ও প্রাপ্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে; সংশ্লিষ্ট থানা অভিযোগের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।

শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, শেষ কোথায় দেখা গেছে, কখন দেখা গেছে, তখন কী পোশাক পরেছিল, কার সঙ্গে ছিল—এসব তথ্য পুলিশকে দ্রুত দিতে হবে।

মুক্তিপণ চাইলে কী করবেন?

অপহরণের পর কেউ ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করলে আতঙ্কিত হয়ে অপরিচিত ব্যক্তির নির্দেশে সবকিছু করা উচিত নয়। যত দ্রুত সম্ভব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানাতে হবে।

ফোন নম্বর, কলের সময়, মেসেজ, ভয়েস রেকর্ড বা অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব নিতে পারেন, যাতে অন্যরা শিশুর সন্ধান ও পরিবারের নিরাপত্তায় মনোযোগ দিতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন নম্বর বা সম্ভাব্য অবস্থান প্রকাশ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

১০৯৮—শিশুর জন্য সহায়তার পথ

শিশুর নিরাপত্তা, নির্যাতন, পাচার, বাল্যবিবাহ বা অন্য কোনো ঝুঁকির ঘটনায় বাংলাদেশে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করা যায়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি টোল-ফ্রি সেবা এবং ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। শিশু নিজে অথবা অন্য কেউ এই নম্বরে ফোন করে সহায়তা চাইতে পারেন।

UNICEF বাংলাদেশও শিশু ও অভিভাবকদের প্রয়োজন হলে ১০৯৮-এ প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ভয় নয়, নিরাপত্তার শিক্ষা

সন্তানকে সবসময় ভয় দেখিয়ে নিরাপদ রাখা যায় না। ‘বাইরে গেলে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে’, ‘অপরিচিত সবাই খারাপ’—এ ধরনের কথা শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত ভয় তৈরি করতে পারে। বরং তাকে বাস্তব পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা শেখাতে হবে।

হারিয়ে গেলে— দৌড়ে কোথাও চলে যাবে না। নিরাপদ কোনো জায়গায় থাকবে। বিশ্বস্ত পুলিশ সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, শিক্ষক বা দায়িত্বশীল পরিবারের কাছে সাহায্য চাইবে। বাবা-মায়ের ফোন নম্বর বলবে।

কেউ জোর করে নিয়ে যেতে চাইলে চিৎকার করবে এবং আশপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তান যেন জানে—বিপদে পড়লে সত্য কথা বললে মা-বাবা তাকে বকবেন না; বরং সাহায্য করবেন।

শিশুর নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়, শুধু স্কুলের দায়িত্বও নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব শিশুকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া।

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজতে যে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হলো আগে থেকেই কিছু অভ্যাস তৈরি করা। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরবে—এই সাধারণ তথ্যগুলো জানা; তার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা; অনলাইন ও অফলাইন আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা; জরুরি ফোন নম্বর শেখানো এবং বিপদের কথা বলার মতো বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা—এসবই শিশুর নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সন্তানকে আগলে রাখার অর্থ তাকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখা নয়; বরং তাকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে বিপদের মুহূর্তে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে এবং দ্রুত সঠিক মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে পারে।

কারণ শিশুর নিরাপত্তায় কয়েক মিনিটের সতর্কতা কখনো কখনো একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্না থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন