যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালালে আগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আইআরজিসি বলেছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে শুধু অস্ত্রের ধরনই নয়, যুদ্ধের কৌশল, লক্ষ্যবস্তু এবং সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধিতেও পরিবর্তন আনা হতে পারে।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি সম্প্রতি ইরানি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, নতুন কোনো হামলা হলে ইরানের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আক্রমণাত্মক অভিযানে ‘গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন’ আসবে। নতুন অস্ত্র ও নতুন সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রে আনা হবে বলেও দাবি করেন তিনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ইরান যে ‘নতুন অস্ত্র’ ব্যবহারের কথা বলছে, সেগুলো আসলে কী?
এখন পর্যন্ত তেহরান প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্রের নাম, পাল্লা, সংখ্যা, প্রযুক্তি বা ধ্বংসক্ষমতা জানায়নি। আইআরজিসির বক্তব্যে শুধু বলা হয়েছে, এমন কিছু অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, যেগুলো সংঘাতের আগের পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়নি।
আইআরজিসি আরও বলেছে, ইরান যুদ্ধ চলাকালে এবং তার আগেও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করেছে এবং সেগুলোর সক্ষমতা ক্রমাগত উন্নত করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কিছু ‘কৌশলগত অস্ত্র’ ব্যবহার করা হতে পারে বলে মোহেবি জানিয়েছেন। তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই।
ফলে ইরানের বক্তব্য থেকে এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে নতুন সক্ষমতা বলতে নতুন কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, উন্নত ওয়ারহেড, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা নাকি অন্য কোনো অস্ত্রকে বোঝানো হয়েছে।
ইরানের হুঁশিয়ারির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি পরিবর্তনের কথা।
মোহেবি বলেছেন, নতুন হামলা হলে ইরান ‘যুদ্ধের ভূগোল’ পরিবর্তন করবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, আগের হামলায় যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সেগুলোই শুধু লক্ষ্য থাকবে না। ইরানের কাছে এমন নতুন লক্ষ্যও রয়েছে, যেগুলো এখনো হামলার শিকার হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
এর অর্থ কী তা অবশ্য ইরান স্পষ্ট করেনি। কোন দেশ, কোন স্থাপনা বা কোন অঞ্চলের কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি।
এই কারণে ‘যুদ্ধের ভূগোল পরিবর্তন’ কথাটিকে সরাসরি নতুন কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং এটি ইরানের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ সংঘাতের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্রিয়ার পরিধি বাড়ানোর একটি প্রকাশ্য সতর্কবার্তা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের চাপ পড়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের উন্নত ওয়ারহেড এবং আক্রমণ কৌশলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইরান যদি ভবিষ্যৎ হামলায় নতুন অস্ত্র বা ভিন্ন ধরনের আক্রমণ-পদ্ধতি ব্যবহার করে, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে কোন নির্দিষ্ট নতুন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ইরানের হাতে কার্যকর অবস্থায় রয়েছে, তা প্রকাশ্য তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার আলোচনায় সাধারণত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের ড্রোন সামনে আসে। কিন্তু এবারের আইআরজিসি বক্তব্যে ‘নতুন সক্ষমতা’ কথাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই বিস্তৃত রাখা হয়েছে।
এর ফলে সম্ভাব্য সক্ষমতার পরিসর নিয়ে বিভিন্ন অনুমান তৈরি হয়েছে। তবে অনুমান আর নিশ্চিত তথ্য এক নয়। তেহরান নিজে নির্দিষ্ট অস্ত্রের নাম প্রকাশ না করা পর্যন্ত কোনো একটি অস্ত্রকে এই ঘোষণার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা ঠিক হবে না।
বিশেষ করে যুদ্ধের সময়ে রাষ্ট্রীয় সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে সক্ষমতার বিষয়ে অস্পষ্টতা রাখা হতে পারে। তাই ইরানের ‘বিশ্বকে বিস্মিত করবে’ ধরনের বক্তব্যকে সামরিক সক্ষমতার স্বাধীন প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
আইআরজিসির মুখপাত্র বলেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং আগের তুলনায় এখন আরও বেশি প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাতের নতুন পর্যায় শুরু হলে ইরানের প্রতিক্রিয়াও আগের পর্যায়ের তুলনায় ভিন্ন হবে।
এ বক্তব্যের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক অবস্থানের একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ তেহরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে অবস্থান করছে। ফলে সামরিক হুঁশিয়ারিকে সরাসরি যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইরানের বক্তব্যে হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গও এসেছে। আইআরজিসির দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এখনো হরমুজ দিয়ে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেনি। এটি অবশ্য ইরানের নিজস্ব মূল্যায়ন; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর সঙ্গে ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
এদিকে এ অঞ্চলে সামুদ্রিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। এপি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি ট্যাংকারের দুই নাবিক আহত হয়েছেন। হামলাটির উৎস তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
ফলে ইরানের ‘যুদ্ধের ভূগোল পরিবর্তন’ বক্তব্যের বাস্তব অর্থ কী হবে, তা হরমুজ ও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করতে পারে। এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
ইরানের পক্ষ থেকে নতুন অস্ত্র ও সক্ষমতার দাবি করা হয়েছে এটি নিশ্চিত। একইভাবে নতুন লক্ষ্যবস্তু ও যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি পরিবর্তনের কথাও প্রকাশ্যে বলা হয়েছে। কিন্তু এসব অস্ত্র ঠিক কী, কতগুলো রয়েছে, কী ধরনের পাল্লা বা ধ্বংসক্ষমতা রয়েছে এবং বাস্তবে সেগুলো কতটা কার্যকর এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য স্বাধীন তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরানের অস্ত্রের নাম নয়, বরং তেহরানের সামরিক বার্তার পরিবর্তন। আগের লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে নতুন লক্ষ্য, প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে নতুন সক্ষমতা এবং সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বাড়ানোর কথা বলে আইআরজিসি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে জানাচ্ছে যে ভবিষ্যৎ সংঘাত আগের ধাঁচে নাও হতে পারে।
তবে এই হুঁশিয়ারি বাস্তবে কতটা সামরিক সক্ষমতায় রূপ নেয়, সেটি নির্ভর করবে ইরানের হাতে থাকা অস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা, মজুত, লক্ষ্য শনাক্ত করার সামর্থ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর।
বিশ্বজুড়ে ডিজেলসংকট, ২০২৭ সালেও কাটবে না চাপ
দাম বাড়ার দৌড়ে বেতন কতটা পিছিয়ে?
সন্দ্বীপের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা গ্রেপ্তার
সাড়ে পাঁচ বছরে ডলারের বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে টাকা
যুদ্ধের মাঠে শক্তি পরীক্ষা দিয়েই এবার জাতিসংঘে গেলো ইরান