ডাকসুর প্রথম ৪ মাসে ২২৫ কাজ ও উদ্যোগ, কার্যবিবরণী প্রকাশ

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম

দায়িত্বগ্রহণের প্রথম চার মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ২২৫টি কাজ ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে বলে জানিয়েছে ডাকসু।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত ‘ডাকসুর চার মাস: কার্যবিবরণী ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কাজ ও উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এ সময় ‘দায়িত্বগ্রহণের প্রথম চার মাসে ডাকসুর কার্যক্রমের বিবরণী’ এবং ‘প্রতিনিধি সম্মেলন ২০২৫’ শীর্ষক দুটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে চার মাসের কার্যবিবরণী উপস্থাপন করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর তারা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে ফলাফল ঘোষণার দিন থেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রথম দুই মাসের কার্যক্রম তুলে ধরা হয় এবং হলভিত্তিক সমস্যাগুলো শোনা হয়। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আজ চার মাসের কাজ ও গৃহীত উদ্যোগগুলো সকলের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাকসুর কাজের ডকুমেন্টেশন হিসেবে দুটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সময় দেওয়া নিজেদের ইশতেহারসহ নির্বাচিত সকল প্যানেলের ইশতেহার নোট করে নিয়ে প্রতিটিতে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমন কোনো ইশতেহার নেই যেখানে কাজ বা উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরপরও শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিতে যদি কোনো ক্ষেত্রে ঘাটতি মনে হয়, তা জানালে সে বিষয়ে অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনকে সামনে রেখে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বাজেটের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে ডাকসুকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল এই প্রতিষ্ঠানকে নিষ্ক্রিয় রাখার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক অসহযোগিতা, অপবাদ ও নানা বাধার মধ্যেও ডাকসু শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে কাজ চালিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বাজেট না পাওয়ার অজুহাতে বসে না থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, দেশি ও আন্তর্জাতিক রিসোর্স পারসন এবং দাতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। চাইলে কাজ না করার ব্যাখ্যা দেওয়া যেত, কিন্তু সেই পথ বেছে নেওয়া হয়নি। নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ৩৩টি খাতে প্রায় ২২৫টি কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, যার বিস্তারিত তথ্য ওয়েবসাইট ও প্রকাশিত বুকলেটে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডাকসুর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবছর নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে রেজুলেশন পাস করে প্রশাসনের কাছে পাঠানো, দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদের এখতিয়ার বহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল, প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ারকন্ডিশনসহ জরুরি সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা, ১৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার ছাত্রী হল নির্মাণ দ্রুততর করতে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা, ২৮০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ কাজ এবং পাঁচটি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সম্মতি আদায়।

এছাড়া ছাত্রীদের ইবাদতের জন্য কার্জন হলের কমনরুমে নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কার, কমনরুম ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট স্থাপন, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালু, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংযোজন, ৫০ শতাংশ ছাড়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে একটি ওয়েলনেস সেন্টারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, আইন ও মানবাধিকার সহায়তার আওতায় ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান এবং হলভিত্তিক একাধিকবার ছারপোকা নিধন কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়।

চার মাসে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সচেতনতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে একাডেমিক এরিয়া ও ছাত্রী হলে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন, সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ব্রেস্ট ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার, মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন এবং স্বল্পখরচে ক্যান্সার চেকআপের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ডাকসু বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক চর্চা জোরদার করে। এর মধ্যে ছিল বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে স্মরণিকা প্রকাশের উদ্যোগ, আলপনা উৎসব, বিজয় দিবসে সাইকেল র‍্যালি ও স্ট্যান্ট শো, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান, প্রকাশনার জন্য লেখা আহ্বান এবং মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। পাশাপাশি সীরাতুন্নবী (সা.) সন্ধ্যা, সীরাত প্রতিযোগিতা, নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসবসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়।

গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা খাতে চারটি সেমিনার আয়োজন, একাধিক আন্তর্জাতিক জার্নালে ফ্রি অ্যাক্সেস, কেন্দ্রীয় ও বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে আলো ও ভেন্টিলেশন উন্নয়ন, লাইব্রেরিতে পরীক্ষার হল বরাদ্দ প্রথা বাতিল, শিক্ষার্থীদের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষণ, প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ, স্পোকেন ইংলিশ কোর্স চালু, স্কিল সামিট আয়োজন এবং গ্রন্থাগারে ই-রিসোর্স সাবস্ক্রিপশনের ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়।

এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জীবনদক্ষতা উন্নয়নে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার প্রশিক্ষণ, মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ, হলভিত্তিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, সেলফ ডিফেন্স কর্মসূচি, ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিমনেসিয়াম নির্মাণ শুরু, পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম, শব্দ দূষণ রোধে দৌড় কর্মসূচি এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক সাইকেল র‍্যালি আয়োজন করা হয়েছে।

পরিবহন খাতে জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তন ও সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেট নিশ্চিত, সকল রুটে সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু, ক্যাম্পাসে ইলেকট্রিক শাটল সার্ভিস চালু, সব ছাত্রী হলকে শাটল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা এবং নির্দিষ্ট রুটে পরিবহন সুবিধা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্যরা।

NB
আরও পড়ুন