আসুন আমরা এই ভদ্রোচিত মিথ্যাটি বাদ দিই যে ব্রিটিশ সাংবাদিকতা মুসলিমদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করে। তারা তা করে না। আর বর্তমানের তথ্য-উপাত্ত, যা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, তা সন্দেহাতীতভাবেই এটি প্রমাণ করে।
'সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং' ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে মুসলিমদের উপস্থাপনার ওপর এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ করেছে। গবেষণায় ৩০টি প্রধান সংবাদমাধ্যমের ৪০ হাজর ৯১৩টি নিবন্ধ পরীক্ষা করা হয়েছে—পুরো এক বছরের সংবাদ কাভারেজকে ব্যবচ্ছেদ ও কোডিং করা হয়েছে এবং পক্ষপাতের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়েছে।
এর উপসংহারটি অত্যন্ত ভয়াবহ: ২০২৫ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে মুসলিমদের নিয়ে করা মোট কাভারেজের প্রায় অর্ধেকই ছিল পক্ষপাতদুষ্ট। 'অর্ধেক'—এই সংখ্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাকে নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি পদ্ধতিগত বা কাঠামোগত সমস্যাকে তুলে ধরে।
বিশ্লেষণ করা নিবন্ধগুলোর ৭০ শতাংশই মুসলিম বা ইসলামকে নেতিবাচক বিষয় বা আচরণের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর এখানে পদ্ধতিগত একটি বিষয় রয়েছে, যা এই পরিসংখ্যানকে অস্বীকার করা আরও কঠিন করে তোলে: গবেষণাটি কেবল সেই নিবন্ধগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না যেখানে মুসলিমরা মূল বিষয় ছিল।
তথ্যভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো নিবন্ধে মুসলিমদের সম্পর্কে একটিমাত্র সাধারণ উল্লেখই যথেষ্ট ছিল। সেই বিচারে, গবেষণার পদ্ধতি ছিল বেশ উদার, এমনকি শিথিলও বলা চলে। তা সত্ত্বেও প্রায় অর্ধেক নিবন্ধই পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই ৫০ শতাংশের পরিসংখ্যান সম্ভবত পক্ষপাতের সর্বনিম্ন সীমা, সর্বোচ্চ নয়।
এবার ঐতিহাসিক রেকর্ডের দিকে তাকানো যাক। পাঁচ বছর আগে, এই কেন্দ্রটি ২০১৮-১৯ সালের ১২ মাসের ব্যবধানে প্রকাশিত ৪৮ হাজারেরও বেশি নিবন্ধের ওপর একই প্যারামিটার ব্যবহার করে একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিল। তখন নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশ; যা এখন ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি কোনো সামান্য বিচ্যুতি নয়, বরং কাঠামোগত অবনতি।
মুসলিমদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশন কেবল শত্রুতাপূর্ণই হয়ে ওঠেনি, বরং এটি এখন একটি বার বার একই অপরাধ করার রোগে পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এখন মুসলিমদের নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি অবজ্ঞাভরে নিবন্ধ প্রকাশ করছে।
ভাষ্যকার পিটার ওবোর্ন যখন বলেছিলেন যে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে—অনেক বেশি খারাপ—তখন তিনি মোটেও বাড়িয়ে বলেননি। উপাত্তগুলোই তা নিশ্চিত করছে।
বিকৃত শব্দচয়ন
ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো এখন আর মুসলিমদের নিয়ে প্রতিবেদন করছে না; বরং তারা তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রচারণা চালাচ্ছে।
একটি সম্প্রদায় নিয়ে সংবাদ প্রচার করা আর তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; একটি ধর্মকে পর্যবেক্ষণ করা আর সেটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মধ্যেও তফাত আছে। এই সংকটের মূলে থাকা সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের পথ বেছে নিয়েছে: দ্য স্পেকটেটর, জিবি নিউজ, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দ্য জিউস ক্রনিকল, দ্য ডেইলি এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি মেইল ও দ্য টাইমস।
এগুলো কোনো প্রান্তিক কণ্ঠস্বর নয়। এগুলো সেই প্রতিষ্ঠান যারা জনমতের গতিপথ নির্ধারণ করে। আর এই প্রতিবেদনের প্রমাণ অনুযায়ী, তারা পদ্ধতিগতভাবে ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ।
তাদের ভাষা লক্ষ্য করুন। প্রতিবেদনে বিকৃত পরিভাষা ব্যবহারের যে বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে, তা পড়লে মনে হবে এটি এমন এক শব্দকোষ যা তৈরি করেছে তারা যারা মুসলিমদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চায়: ‘মুসলিম পুরুষদের গ্যাং’, ‘ঘাতক আদর্শ’, ‘ঘৃণা মিছিল’, ‘মৃত্যুর কাল্ট’, ‘ইসলামপন্থী ইহুদি-বিদ্বেষী’, ‘আধুনিকতাকে উৎখাত করা’, ‘তাণ্ডব চালানো’।
এগুলো কোনো বর্ণনামূলক শব্দ নয়, এগুলো অস্ত্র। জিবি নিউজ নতুন যাত্রা শুরু করলেও পক্ষপাতের সব সূচকে তারা নিকৃষ্টতমদের কাতারে রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি শিরোনাম তাদের সম্পাদকীয় সংস্কৃতিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে: ‘আমাকে অভদ্র হতে দিন: মুসলিমরা ইহুদিদের প্রতি বর্ণবাদী’। এখানে লেখকের অবজ্ঞাকে ‘সাহস’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গোঁড়ামিকে যখন বীরত্ব হিসেবে বাজারজাত করা হয়, তখন সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না, উস্কানিতে পরিণত হয়।
দ্য স্পেকটেটর-এ চরম পক্ষপাতের হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে; তাদের প্রতি চারটির মধ্যে একটি নিবন্ধকে ‘ভীষণ পক্ষপাতদুষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি এমন কোনো প্রকাশনা নয় যা মাঝেমধ্যে কুসংস্কারে হোঁচট খায়; বরং এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে মুসলিম-বিদ্বেষ ধারাবাহিকভাবে ফুটে ওঠে।
দ্য স্পেকটেটর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল যেখানে তারা আপাত বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে কেন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মানুষকে ‘ঈদ মোবারক’ জানাবেন! একজন ব্রিটিশ নেতা এ দেশের অন্যতম পালিত একটি ধর্মীয় উৎসবের স্বীকৃতি দেওয়াকে যখন ব্যাখ্যা করার মতো বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তখন এটিই আপনাকে বুঝিয়ে দেয় যে জনজীবনে মুসলিমদের উপস্থিতিকে কতটা প্রতিকূলতার চোখে দেখা হচ্ছে।
আর এই প্রচারণা নতুন বছরেও থেমে নেই। ২০২৬ সালেও এটি অব্যাহত রয়েছে, যেখানে মুসলিমদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। মুসলিম ভোটাররা তাদের অধিকার প্রয়োগ করাকে ‘সাম্প্রদায়িক ভোট’, ‘পারিবারিক ভোট ব্যাংক’ বা সন্দেহজনক ও সমন্বিত কিছু হিসেবে উপস্থাপন করা ইসলামভীতিমূলক শব্দকোষের সর্বশেষ সংযোজন।
যখন একজন মুসলিম ভোট দেন, সেটি হয় ‘ব্লক ভোটিং’। যখন একটি মুসলিম সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়, সেটি হয় ‘গণতন্ত্রের জন্য হুমকি’। এগুলো তাদের ব্যবহৃত ভাষা যারা প্রিন্ট মিডিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়—এবং তাদের ভাষা যারা লোকদেখানো ভণ্ডামি ছেড়ে স্রেফ আমাদের অস্তিত্বই মুছে দিতে চায়।
বিপজ্জনক ও বিষাক্ত
একটি তথ্য কেবল ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নয়, বরং সবাইকে অভিযুক্ত করে। সেটি হলো ‘প্রাসঙ্গিক তথ্যের অনুপস্থিতি’ —অর্থাৎ পাঠককে একটি ঘটনা সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়া। ৪৪ শতাংশ পক্ষপাতদুষ্ট নিবন্ধে এই চিত্র পাওয়া গেছে। পুরো ডেটাসেটে এটিই মিডিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। এর জন্য সবসময় বিদ্বেষের প্রয়োজন হয় না।
অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যক মানুষের সম্পৃক্ততা আছে এমন চরমপন্থার কোনো খবর দেওয়ার সময় প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করা; কোনো রাজনীতিবিদের উস্কানিমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা যুক্তি না দিয়েই তা উদ্ধৃত করা—এর জন্য ঘৃণার প্রয়োজন নেই, কেবল অবহেলাই যথেষ্ট। কিন্তু হাজার হাজার নিবন্ধ এবং ডজন ডজন সংবাদমাধ্যমে এই অবহেলার পুনরাবৃত্তি যখন ঘটে, তখন এর প্রভাবের দিক থেকে এটি আর বিদ্বেষের চেয়ে আলাদা থাকে না।
বিবিসি সব সূচকেই পক্ষপাতের সর্বনিম্ন হার রেকর্ড করেছে। এই হতাশাজনক পরিস্থিতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি প্রমাণ করে যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে মুসলিম ও ইসলাম নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা সম্ভব।
জনসেবা বা পাবলিক সার্ভিসের দায়িত্বগুলো কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক আমলাতন্ত্র নয়। এগুলো শিল্পের নিকৃষ্টতম প্রবৃত্তিগুলোকে ঠেকানোর একটি কার্যকর উপায়—যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের রক্ষা করার দাবিকে আগের চেয়ে আরও জরুরি করে তুলেছে।
ব্রিটিশ সাংবাদিকতার অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব কেভিন ম্যাগুইয়ার কেন্দ্রের এই ফলাফলগুলোকে ‘লজ্জাজনক, বিপজ্জনক এবং বিষাক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সঠিক। আর তার মতো একজন সাংবাদিক যখন জনসমক্ষে এটি বলতে বাধ্য হন, সেটিই প্রমাণ করে পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে।
প্রশ্ন এখন আর এটা নয় যে এমনটা ঘটছে কিনা। উপাত্তগুলো তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো এখন কী হবে? সম্পাদকরা কি এই প্রতিবেদন পড়বেন এবং কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও তাদের নিউজরুমের সংস্কৃতিতে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আনবেন? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো—যারা এতদিন এড়িয়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য মানসিকতা দেখিয়েছে—তারা কি শেষ পর্যন্ত প্রমাণের ভিত্তিতে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করবে?
রাজনীতিবিদরা—যাদের অনেকে নির্বাচনি ফায়দার জন্য এই বিদ্বেষকে পুঁজি করেছেন ও ছড়িয়ে দিয়েছেন—তারা কি সততার সঙ্গে তাদের নিজেদের দায় স্বীকার করবেন? নাকি আমরা এই প্রতিবেদনটিকেও আগেরগুলোর মতো ফাইলবন্দি করে রাখব এবং উপযুক্ত জায়গায় কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করে পরের গবেষণার জন্য অপেক্ষা করব, যা আমাদের ইতোমধ্যেই জানা সত্যগুলোকেই আবার নিশ্চিত করবে?
ব্রিটিশ মুসলিমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাচ্ছে না। তারা কেবল তথ্যের নির্ভুলতা এবং ন্যায্যতার সেই মৌলিক মানদণ্ডটুকুই চাইছে যা সব সম্প্রদায়ের প্রাপ্য। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কার্যকর গণমাধ্যমের জন্য এটিই সর্বনিম্ন চাহিদা।
কিন্তু সেই সর্বনিম্ন চাহিদাটুকুও পূরণ হচ্ছে না। যারা এটি পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে তারা ভালো করেই জানে তারা কারা। আর এখন, বাকি সবাইও তা জেনে গেছে।
নেপালে বাস খাদে পড়ে নিহত ৭ ভারতীয় 
