জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও জ্বালানি পরিস্থিতির দিক থেকে ২০২৬ সালকে ভবিষ্যতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে দেখা হতে পারে। কারণ চলতি বছরের প্রথমার্ধেই এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব আগামী বহু বছর বিশ্বজুড়ে অনুভূত হতে পারে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা,এই তিনটি বিষয় এখন বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য হুমকি দূর করা এবং দেশটির ভেতরে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে কয়েক দফা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা হয়েছে, এমনকি একটি চুক্তিও হয়েছিল, যা পরে ভেঙে যায়।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হতো। ইরান এই পথ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এটি নিয়মিতভাবে চালু রাখতে পারেনি। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
জাপান থেকে মিসর পর্যন্ত অনেক দেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলের কৌশলগত মজুত ব্যবহার করেছে। কোথাও কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই জ্বালানি সংকট অনেক দেশকে বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। এর ফলে সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো সবুজ প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ চীন বড় সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলেও এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন চলতে পারে।
এদিকে ২০২৬ সালজুড়ে বিজ্ঞানীরা এল নিনো নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার এই প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনাকে এবার অত্যন্ত শক্তিশালী বা “সুপার” এল নিনো হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই এল নিনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্ম শুরুর মাত্র এক মাসের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে এবং অনেক জায়গায় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে।
এল নিনো সাধারণত বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উত্তরাঞ্চলে এটি উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া তৈরি করে, যা দাবানলের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এরই মধ্যে কানাডা, মিনেসোটা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বড় ধরনের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এসব আগুনের ধোঁয়া মধ্য-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকায় এল নিনো অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণ হতে পারে। এশিয়ার দেশগুলো এবং অস্ট্রেলিয়ায় এটি দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তাপপ্রবাহ বাড়াতে পারে। এসব প্রভাব এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে এবং আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত এল নিনো প্রায় এক বছর স্থায়ী হয় এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও ২০২৬ সালে নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রতিযোগিতা কয়েক বছর ধরেই চলছে। তবে এ বছর নতুন বিষয় হয়ে উঠেছে এসব ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের প্রতিবাদ এবং এআইয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ।
বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মানুষ নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের জ্বালানি ব্যবহার প্রকাশ করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে এক বছরের স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুৎ অনেক কোম্পানির জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে বাধা তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়তে পারে, এ নিয়েও নীতিনির্ধারকেরা উদ্বিগ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে কয়লা, তেল ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর জোর দিয়েছে। তবে এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের কারণে ভবিষ্যতে এসব নীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ এআই চালাতে বিপুল শক্তির প্রয়োজন, আর সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস এখন কম খরচে দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
এআই প্রযুক্তির বিস্তার থামার সম্ভাবনা কম। ফলে জলবায়ু, জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার বর্তমান নীতিতে আগামী দিনগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
দশ জেলায় স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
ঝোড়ো হাওয়া-বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা
ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ১৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা
বৃষ্টি নিয়ে যে বার্তা দিলো আবহাওয়া অফিস
রাতের মধ্যে যেসব অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা