ক্যানসার চিকিৎসার আগে দ্বিতীয় চিকিৎসকের পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬ এএম

ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে চান অধিকাংশ রোগী ও তাঁদের পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরুর আগে আরেকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে, উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নিতে এবং মানসিক দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি ‘সেকেন্ড ওপিনিয়ন’ বা দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত হিসেবে পরিচিত। এর অর্থ হলো, অন্য একজন চিকিৎসক রোগীর রোগ নির্ণয়ের প্রতিবেদন, পরীক্ষার ফলাফল ও প্রস্তাবিত চিকিৎসাপদ্ধতি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করবেন। প্রয়োজনে তিনি রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে পারেন, আগের সিদ্ধান্ত সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারেন কিংবা বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতির কথা জানাতে পারেন।

দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত নেওয়া মানে প্রথম চিকিৎসকের ওপর অবিশ্বাস করা নয়। বরং নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো বিবেচনা করার একটি স্বীকৃত উপায়।

ক্যানসার নির্ণয়ে কেন দ্বিতীয় মতামত জরুরি

ক্যানসারের ধরন ও উপধরন অনেক। সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে আক্রান্ত টিস্যু অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা, বিশেষ রঞ্জক ব্যবহার, আণবিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ধরনের স্ক্যানের প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগ নির্ণয়ের প্রতিবেদন পুনরায় পর্যালোচনা নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পর্যালোচনায় রোগ নির্ণয় অথবা রোগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসে। বিরল ও জটিল ক্যানসার—যেমন সারকোমা, লিম্ফোমা এবং মস্তিষ্ক ও স্ত্রীরোগ-সংক্রান্ত কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে এ ধরনের পর্যালোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দ্বিতীয় চিকিৎসক রোগের ধরন ও পর্যায় সম্পর্কে আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত কি না, তা যাচাই করতে পারেন। এতে চিকিৎসার পরিকল্পনা আরও নির্ভুল করার সুযোগ তৈরি হয়।

ক্যানসারের চিকিৎসায় বাড়ছে বিকল্প

ক্যানসার চিকিৎসায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। রোগের ধরন, পর্যায় ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এখন বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে কম কাটাছেঁড়ায় অস্ত্রোপচার, রোবটের সাহায্যে অস্ত্রোপচার, আধুনিক রেডিওথেরাপি, টিউমারের জিনগত পরিবর্তন অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসা, ইমিউনোথেরাপি, হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণের সুযোগ।

সব চিকিৎসক বা হাসপাতাল প্রতিটি পদ্ধতিতে সমানভাবে বিশেষায়িত নয়। তাই দ্বিতীয় কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে রোগীর জন্য উপযোগী অন্য কোনো চিকিৎসার সুযোগ আছে কি না, তা জানা যেতে পারে।

চিকিৎসার সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

ক্যানসারের চিকিৎসা রোগীর প্রজননক্ষমতা, শারীরিক গঠন, অঙ্গের কার্যক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে স্তন সংরক্ষণ করে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব কি না, কণ্ঠনালি অক্ষত রাখা যাবে কি না কিংবা স্নায়ুর কার্যক্ষমতা রক্ষার সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয় রোগের অবস্থা ও চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞ দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে পারে।

দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার ফলে রোগী সম্ভাব্য সুবিধা, ঝুঁকি ও বিকল্প সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারেন। এতে নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

কখন দ্বিতীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত

কিছু পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। যেমন, ক্যানসার বিরল বা অস্বাভাবিক হলে, রোগ নির্ণয় নিশ্চিত না হলে কিংবা প্রতিবেদনে ‘সন্দেহজনক’, ‘অস্বাভাবিক’ বা রোগটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাচ্ছে না—এমন শব্দ থাকলে অন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হলে, বিশেষ করে কোনো অঙ্গ অপসারণ বা তার কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, বিকল্প চিকিৎসা সম্পর্কে আলোচনা না করা হলে, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে বা আবার ফিরে এলে দ্বিতীয় মতামত সহায়ক হতে পারে।

চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, প্রস্তাবিত চিকিৎসা নিয়ে দ্বিধা থাকা কিংবা নতুন কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি বা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পর্কে জানতে চাইলেও দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।

দ্বিতীয় মতামতের জন্য চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করা কি ঝুঁকিপূর্ণ?

রোগীদের সাধারণ উদ্বেগ হলো, দ্বিতীয় চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হলে রোগের অবস্থা খারাপ হবে কি না।

মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্যানসারের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার জন্য এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় নেওয়া সাধারণত চিকিৎসার ফলাফলে প্রভাব ফেলে না। তবে এটি সব ধরনের ক্যানসার বা সব রোগীর জন্য প্রযোজ্য নয়। রোগের ধরন, অগ্রগতি, উপসর্গ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। যেমন, তীব্র লিউকেমিয়া, দ্রুত অগ্রসর হওয়া কিছু লিম্ফোমা কিংবা ক্যানসারের কারণে মেরুদণ্ডের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি, গুরুতর রক্তক্ষরণ বা শ্বাসনালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে।

তাই দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার আগে চিকিৎসককে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা উচিত, অল্প কিছুদিন অপেক্ষা করা নিরাপদ হবে কি না। চিকিৎসা শুরুর সময়সীমা নির্ধারণে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় মতামত নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন, দ্বিতীয় চিকিৎসকের পরামর্শ চাইলে প্রথম চিকিৎসক অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু চিকিৎসাক্ষেত্রে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক চিকিৎসকও রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করেন।

আরেকটি ধারণা হলো, দ্বিতীয় চিকিৎসকও হয়তো একই কথা বলবেন। বাস্তবে তা-ই হতে পারে। তবে দুই বিশেষজ্ঞের মতামত এক হলে রোগী নিজের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন। আবার মতপার্থক্য দেখা দিলে তার কারণ বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া অনেক হাসপাতাল দ্রুত পরামর্শ এবং অনলাইনে প্রতিবেদন পর্যালোচনার সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে সব সময় সরাসরি অন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসক দেখানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে।

দ্বিতীয় মতামত নিতে কী করবেন

প্রথমে নিজের চিকিৎসককে জানান যে আপনি আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে চান। প্রয়োজনে তিনি চিকিৎসার নথিপত্র সংগ্রহ করতে এবং উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ বা হাসপাতাল খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারেন।

এমন চিকিৎসক বেছে নেওয়া ভালো, যিনি সংশ্লিষ্ট ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় নিয়মিত কাজ করেন। পাশাপাশি হাসপাতালে একাধিক বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

পরামর্শ নেওয়ার সময় রোগ নির্ণয়ের প্রতিবেদন, বায়োপসির স্লাইড ও টিস্যুর নমুনা, স্ক্যানের প্রতিবেদন এবং মূল ছবি, রক্ত পরীক্ষার ফলাফল, টিউমার মার্কারের তথ্য, আণবিক ও জিনগত পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং আগে নেওয়া চিকিৎসার বিবরণ সঙ্গে রাখা উচিত। বর্তমানে যেসব ওষুধ খাচ্ছেন এবং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে তার তথ্যও চিকিৎসককে জানাতে হবে।

চিকিৎসকের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা যেতে পারে—রোগ নির্ণয় ও ক্যানসারের পর্যায় সম্পর্কে তিনি একমত কি না, কী কী চিকিৎসার বিকল্প রয়েছে, প্রতিটির সুবিধা ও ঝুঁকি কী, চিকিৎসা দৈনন্দিন জীবন ও কাজের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে এবং কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন।

দুই চিকিৎসকের মতামত ভিন্ন হলে তাঁদের যুক্তি বুঝে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কিংবা একাধিক বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত টিউমার বোর্ডে রোগীর বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

টিউমার বোর্ডের ভূমিকা

অনেক ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রে সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট ও প্যাথলজিস্ট একসঙ্গে বসে রোগীর অবস্থা পর্যালোচনা করেন। এ ধরনের দলগত আলোচনাকে টিউমার বোর্ড বলা হয়।

এতে বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার বিকল্পগুলো মূল্যায়ন করেন। ফলে একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত এক জায়গায় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা টিউমার বোর্ডে পর্যালোচনা করা সম্ভব কি না, তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া যেতে পারে।

চিকিৎসা চলাকালেও দ্বিতীয় মতামত নেওয়া যায়

দ্বিতীয় মতামত শুধু রোগ নির্ণয়ের সময়ের জন্য নয়। চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গুরুতর হওয়া, নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি প্রস্তাব করা কিংবা চিকিৎসার পর ক্যানসার ফিরে আসার মতো পরিস্থিতিতেও অন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া অনেক হাসপাতাল এখন অনলাইনে দ্বিতীয় মতামত দেওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে। রোগীরা ডিজিটাল মাধ্যমে পরীক্ষার প্রতিবেদন, স্ক্যানের ছবি ও প্যাথলজির তথ্য পাঠিয়ে ভিডিও কলে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। বড় চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে দূরে বসবাসকারী রোগীদের জন্য এটি সুবিধাজনক হতে পারে।

মানসিক দুশ্চিন্তা কমাতেও সহায়ক

দ্বিতীয় চিকিৎসকের মতামত শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিকল্প যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি রোগীর উদ্বেগ কমাতে, চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপর আস্থা বাড়াতে এবং পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করতেও সাহায্য করতে পারে।

ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় কী করা হচ্ছে, কেন করা হচ্ছে এবং সামনে কী হতে পারে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকলে রোগী চিকিৎসার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন।

সব মিলিয়ে, ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করার আগে দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে চিকিৎসা বিলম্ব করা নিরাপদ কি না, তা অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ, সঠিক বিশেষজ্ঞ নির্বাচন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রস্তুত রাখার মাধ্যমে রোগী নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

সূত্র: আমেরিকান অনকোলজি

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত