জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় বিকালে দেওয়া এই ভাষণে তিনি বৈশ্বিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান, কূটনীতি, বহুপাক্ষিকতা, নিরস্ত্রীকরণ ও বিশ্বশান্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন।
এছাড়া জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তা, পরিবেশ সুরক্ষা, অভিবাসীদের অধিকার, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি ৩১ দফা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা, নারী ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন।
নিচে তার ভাষণের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হলো:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
মাননীয় সভাপতি,
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একইসঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অবদানকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ ও আহতের প্রতি আমি জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।
ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্র ও জনগণকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
আমি বিশ্বাস করি, আমরা বিশ্বাস করি—জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার পিতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন।
একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ ও জনগণের স্বার্থে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি।
বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তেই যা কিছু ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানবসৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট।
যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি।
আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব। এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয়; বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি, তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।
একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়।
শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্বমানবতা ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি।
স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
মাননীয় সভাপতি,
চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All”—অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল।
পিসবিল্ডিং কমিশনের ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ নারী, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ এ বছর উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণার ৪০তম এবং ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।
অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশে অভিবাসীগণ তাঁদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ—উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, কল্যাণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো সহযোগিতা আশা করে।
মাননীয় সভাপতি,
বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে।
এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।
বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।
এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে।
পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য আমি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।
বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
মাননীয় সভাপতি,
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশ তেমন ভূমিকা না রাখলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে।
সুতরাং ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ COP31-এ আরও জোরালো পদক্ষেপ আশা করছে।
বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে।
ক্লিন এনার্জি ও সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দেশকে বন্যা ও খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে।
বাংলাদেশের বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে।
একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের Water Convention স্বাক্ষর করেছে।
মাননীয় সভাপতি,
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের আমলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের অভিযোগের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার Recovery, Restoration and Reconstruction—৩-আর কৌশল অনুসরণ করছে।
বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে Manufacturing Hub হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়।
দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য Start-up উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।
মাননীয় সভাপতি,
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন।
নারীশিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে।
স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত করা হয়েছে।
শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চায়—যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে।
সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে সরকার।
প্রতিটি পরিবারে নারীপ্রধানের নামে ইস্যু করা ফ্যামিলি কার্ডকে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে।
প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ইউনিভার্সাল কার্ড চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
মাননীয় সভাপতি,
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে।
জাতিসংঘ ঘোষিত SDG—“Leave No One Behind”-এর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।
সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সাল এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ ও পোশাক, অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার ও শিক্ষার মান বাড়বে।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষার সিলেবাসে প্রথমবারের মতো স্পোর্টসকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুলশিক্ষার্থীদের নিয়ে সারা দেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
মাননীয় সভাপতি,
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গড়বে আগামীর বিশ্বের ভবিষ্যৎ।
আমরা Artificial Intelligence, Biotechnology এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের Artificial Intelligence-এর বিভাজনে পরিণত হোক।
বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
Artificial Intelligence এবং Social Media-এর বিকাশ ও এর দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মাননীয় সভাপতি,
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি।
কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে—বিশ্বসমাজকে টিকতে হলে একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী এবং রোগ নির্ণয় সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
মাননীয় সভাপতি,
রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই—যে রাষ্ট্রে মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।
মাননীয় সভাপতি,
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে। নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে। প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে।
সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা।
এজন্যই আমরা বলি—সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।
বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
মাননীয় সভাপতি, আপনাকে ধন্যবাদ।
আল্লাহ হাফেজ।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
জাতিসংঘে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
নিরাপদ-সাশ্রয়ী অভিবাসন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বাসের পর প্রায় ৮ শতাংশ বাড়লো লঞ্চ ভাড়া
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণ বর্জন
১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী নির্মাণ ইরানের