‘তরুণ প্রজন্মের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ হবে’

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

তরুণ প্রজন্মের হাতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ হবে— এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘দেশের মানুষ এখন আর পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায় না; তারা চায় বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক একটি নতুন বাংলাদেশ। আজকের তরুণরা বাংলাদেশ ২.০–এর স্বপ্ন দেখছে।’

মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। 

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেওয়া এই ভাষণে তিনি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, রাষ্ট্র সংস্কার, তরুণ নেতৃত্ব, সুশাসন, গণভোট, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রবাসীদের ভূমিকা— এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।

ভাষণের শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। একই সঙ্গে জুলাইয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন তিনি।

জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। তার ভাষায়, ‘রাস্তায় নেমেছিল তরুণরা, মা-বোনেরা, শ্রমিক-রিকশাচালক, পেশাজীবী মানুষ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই হয়েছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দাবিতে, পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো ভাঙার প্রয়োজনে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার হরণ এবং নির্বাচনকে ‘তামাশায়’ পরিণত করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আর জুলাই চাই না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে জনগণকে আর কখনো রাস্তায় নামতে হবে না। এজন্য রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’

তার মতে, জুলাই-পরবর্তী সরকার কিছু সংস্কার উদ্যোগ নিলেও অনেকগুলো বাস্তবায়ন হয়নি কিংবা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। এ অবস্থায় সংস্কারকে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।’

ভাষণের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল তরুণদের ভূমিকা ও সম্ভাবনার আলোচনা। জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু একটি মহল সেই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে— কারণ পরিবর্তন হলে তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস সবার থাকে না। সেই সাহস দেখিয়েছেন আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদীসহ জুলাইয়ের আন্দোলনের শহীদ ও সহযোদ্ধারা।’

তরুণদের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তারা পরিশ্রমী, সাহসী, মেধাবী এবং প্রযুক্তিবান্ধব। তারা সত্য বলতে দ্বিধা করে না এবং নতুনকে গ্রহণ করতে জানে। তারাই পারবে নতুন বাংলাদেশ গড়তে।’

শাসক শ্রেণির সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘ক্ষমতায় গিয়ে তারা নিজেদের দেশের মালিক মনে করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্পকে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর যেসব প্রতিনিধি সংসদ, সরকার কিংবা স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা কেউই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হননি। ‘দেশের মানুষই তার সাক্ষী’ —এমন মন্তব্য করেন তিনি।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে জাতির জন্য একটি ‘মহাসুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই নির্বাচন দিয়েই লুটেরা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ শেষ করার সুযোগ এসেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জনগণকে ঠিক করতে হবে— তারা তরুণ, নারী, শ্রমিক, বয়স্ক ও প্রান্তিক মানুষের জন্য কেমন বাংলাদেশ চায়। একই সঙ্গে শোষণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাই।’

জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান— এই পাঁচ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলতে হবে। নীতি ও নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতি ছাড়া জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।’

নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘যে সমাজ নারীর সম্মান নিশ্চিত করতে পারে না, সে সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। ক্ষমতায় এলে নারীরা সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন। বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান— সবার দেশ। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ নির্যাতনের শিকার হলে তা প্রতিরোধ করা হবে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম মর্যাদার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া হবে। জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাই হবে পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।’

প্রবাসীদের ভূমিকার প্রশংসা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ভবিষ্যতে প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন এবং সংসদে আনুপাতিক হারে প্রবাসী প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের জোট প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‘আল্লাহ আমাদের প্রতি সহায় হোন। আসুন, অতীতের রাজনীতি পরিহার করে সবাই মিলে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি’ বলে ভাষণ শেষ করেন ডা. শফিকুর রহমান।

AHA
আরও পড়ুন