এক সেকেন্ডের সময়কে যদি ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মুহূর্তে ভাগ করে প্রতিটি মুহূর্ত মেপে নেওয়া যেত, ঠিক কতটা নিখুঁত হতো সেই পরিমাপ? সিঙ্গাপুরের সেন্টার ফর কোয়ান্টাম টেকনোলজিসের (সিকিউটি) বিজ্ঞানীরা এমনই এক অবিশ্বাস্য পারমাণবিক ঘড়ি (অ্যাটমিক ক্লক) তৈরি করেছেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত ও নির্ভুল সময় গণনার রেকর্ড গড়েছে।
বিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই নতুন ঘড়ির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের (এনইউএস) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং সিকিউটির প্রধান গবেষক মুরে ব্যারেট দাবি করে বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, বর্তমানে আমাদের তৈরি এই ঘড়টিই বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল ঘড়ি।
লুটেশিয়াম (Lutetium) নামক এক বিরল উপাদানের আয়ন দিয়ে তৈরি এই ঘড়িটি এর আগের সব পারমাণবিক ঘড়ির নির্ভুলতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
কীভাবে কাজ করে এই আশ্চর্য ঘড়ি?
পারমাণবিক ঘড়ি মূলত কোনো পরমাণুর ভেতরে ইলেকট্রনের শক্তি পরিবর্তনের কম্পাঙ্ককে (ফ্রিকোয়েন্সি) কাজে লাগিয়ে সময় গণনা করে। পরমাণুর এই কম্পাঙ্ক অপরিবর্তনীয়। একটি লেজার রশ্মিকে এই কম্পাঙ্কের সঙ্গে মেলানো হয় এবং লেজারের আলোর দোলন পেন্ডুলামের মতো কাজ করে সময়ের হিসাব রাখে।
১৯৬০-এর দশক থেকে সিজিয়াম (Cesium) পরমাণু ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সময় নির্ধারণ করা হতো, যা দিয়ে জিপিএস ও বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা চালিত হয়। তবে সম্প্রতি সময়ে গবেষকরা আরও দ্রতগতিতে স্পন্দিত হওয়া ইটারবিয়াম, স্ট্রনশিয়াম বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো উপাদান দিয়ে ঘড়ি বানিয়ে সূক্ষ্ম সময় মাপার চেষ্টা করছিলেন। এবার সব ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের দলটি লুটেশিয়াম ব্যবহার করে অনন্য সাফল্য পেল।
গবেষক দলটি লুটেশিয়াম ঘড়ির কম্পাঙ্ক দশমিকের পর ১৯ ঘর পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করেছে। এই ঘড়ির অনিশ্চয়তার মাত্রা মাত্র ১ × ১০^-১৯, যা বিশ্বের যেকোনো অপটিক্যাল পারমাণবিক ঘড়ির জন্য এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
লুটেশিয়ামের সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য
লুটেশিয়াম পরমাণুর মূল সুবিধা হলো, তাপমাত্রা বা চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত কোনো বাধা এর কম্পাঙ্ককে প্রভাবিত করতে পারে না। মুরে ব্যারেট জানান, আমেরিকার ডেথ ভ্যালির মতো পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফাচ্ছন্ন শীতলতম স্থানে নিয়ে গেলেও এই লুটেশিয়াম ঘড়ি একই রকম নিখুঁত সময় দেবে।
এক টেবিলে দুই ঘড়ির পরীক্ষা
গবেষণার সত্যতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা লুটেশিয়াম দিয়ে দুটি পৃথক ঘড়ি তৈরি করেন এবং ২০০ ঘণ্টা ধরে সেগুলোর সময়ের তুলনা করেন। নতুন এই ঘড়িগুলো এতটাই সংবেদনশীল যে, মাত্র ৫ মিলিমিটার উচ্চতার ব্যবধানের কারণে পৃথিবীর অভিকর্ষের প্রভাবের ফলে যে সময়ে পরিবর্তন আসে, তাও নিখুঁতভাবে ধরে ফেলতে পারে!
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য এখন ল্যাবরেটরির সুবিশাল এই যন্ত্রটিকে ছোট আকারে (পোর্টেবল) রূপান্তর করা, যাতে এটিকে সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা যায়। গবেষকদের আশা, আন্তর্জাতিক সময় নির্ধারণ সংস্থা ২০৩০ সালের পর 'এক সেকেন্ড'-এর সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনায় অংশ নিয়ে অভিশংসনের মুখে আরাগচি
সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর শঙ্কা, বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?