পুতিন যাকে ভয় পেতেন

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:১৮ এএম

কয়েক দশক ধরে রাশিয়াকে একহাতে শাসন করে যাচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই চলার পথে যাকে হুমকি হিসেবে মনে করছেন তাকেই মেরে ফেলছেন তিনি। এবার তার শিকারে পরিণত হলেন দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি। স্থানীয় সময় শুক্রবার কারাগারে তার মৃত্যু হয়েছে। এই নাভালনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সবচেয়ে বড় হুমকি।

নাভালনি আজীবন প্রেসিডেন্ট পুতিনের দুর্নীতি ও অপশাসন নিয়ে কথা বলে গেছেন। সবচেয়ে ক্ষমতাধর হওয়া সত্ত্বেও নাভালনিকে নিয়ে পুতিনের ভয়ের শেষ ছিল না। এর আগে ২০২০ সালে একবার নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। ওই বছরের আগস্টে রাশিয়ার সাইবেরিয়া এলাকা থেকে উড়োজাহাজে যাত্রার সময় ফ্লাইটের ভেতর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে উড়োজাহাজে করে বার্লিনে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। এরপর দীর্ঘ সময় কোমায় ছিলেন নাভালনি। 

তখন অভিযোগ উঠেছিল, নাভালনিকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও রুশ কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও প্রিয় দেশে রাশিয়ায় ফিরে এসেছিলেন নাভালনি। এরপর আরও একবার তিনি আলোচনায় এসেছিলেন কারাগার থেকে নিখোঁজ হওয়ার মাধ্যমে। 

গত বছর ডিসেম্বরের শুরুর দিকে তার আইনজীবীরা বলেন, কারাবন্দী নাভালনির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এ অভিযোগের প্রায় ২৫ দিন পর নাভালনির সন্ধান পাওয়া যায়। নাভালনির মুখপাত্র কিরা ইয়ারমিশ জানান, নাভালনি বেঁচে আছেন। তাকে সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। শুক্রবার সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানাল পুতিনের সরকার। 

২০২১ সালের জানুয়ারিতে জার্মানি থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফিরে এলে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় নাভালনিকে। এর পরের মাসে অর্থ আত্মসাতের পুরোনো একটি মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরপর উগ্রপন্থায় উসকানি ও অর্থায়ন এবং একটি উগ্রপন্থী সংগঠন প্রতিষ্ঠার দায়ে নাভালনিকে গত বছরের আগস্টে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। 

২০১৮ সালে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক নিবন্ধে বলেছিল, পুতিন সবচেয়ে বেশি ভয় পান যে ব্যক্তিকে, তিনি হলেন নাভালনি। মাত্র ৪৭ বছরে চলে যাওয়া নাভালনি পুতিনের কট্টর সমালোচক হয়ে উঠেছিলেন। তার উত্থান মূলত ব্লগ লেখার মধ্য দিয়ে। তিনি তার ব্লগে একের পর পুতিন সরকারের দুর্নীতি নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন। তিনি পুতিনকে দুষ্টু ও চোর বলে অভিহিত করেছিলেন।

এ ছাড়াও পুতিনের বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভ করেছিলেন নাভালনি। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পুতিনবিরোধী বিক্ষোভের সময়ে তিনি একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এরপর ২০১৩ সালে মস্কোর মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি ২৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিনের সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাভালনি। কিন্তু তাকে নানাভাবে বাধা দেয়া হয়।

এরপর রাষ্ট্রের প্রায় সব গণমাধ্যমই নাভালনিকে বয়কট করেছিল। নাভালনির কোনো ধরনের খবর প্রকাশ করত না। তিনি ও তার সমর্থকেরা পুতিনের আভিজাত্যকে ধ্বংস করতে ইউটিউবকে বেছে নিয়েছিলেন। তারা ইউটিউবে চ্যানেল খুলে পুতিনবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাতেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নাভালনি ছিলেন একগুঁয়ে, ব্যঙ্গাত্মক ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তার একটি ডাকেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসতো। তিনি ছিলেন জনতাবাদী, তাই তরুণরা তাকে অসম্ভব পছন্দ করতো। মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া, দুটি সন্তান ও অসংখ্য সমর্থক রেখে গেছেন। নাভালনির সমর্থকেরা তাকে আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসনস ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনা করতেন। তারা আশায় ছিলেন, খুব শিগগিরই তিনি কারামুক্ত হবেন।

SN/FI
আরও পড়ুন