আধুনিক বিশ্বে একনায়কতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কেউ পথের কাঁটা হয়ে উঠতে পারেন, এমন আঁচ করতে পারলে তার জান কবচ করতে দেরি করেন না তিনি। রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা অ্যালেক্সাই নাভালনির ক্ষেত্রে তাই করেছে পুতিনের প্রশাসন। কারাগারে বন্দি অবস্থায়ও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন নাভালনি। সম্প্রতি কারাগারেই তার মৃত্যু হয়েছে। পুতিনের ইশারাতে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাভালনির মৃত্যুর খবরে রাশিয়া ও বহির্বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্ব পুতিন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কেউ কেউ বলছেন, কোনো কোনো মৃত্যু পুনর্জন্মের প্রবেশদ্বার মাত্র। মৃত নাভালনি জীবিত নাভালনির চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। এই প্রতিক্রিয়ার ঝড় অব্যাহত থাকলে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে পুতিনের সাম্রাজ্য।
বলা হয়ে থাকে, নাভালনিকে সবচেয়ে ভয় পেতেন পুতিন, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে করতেন। কারণ নাভালনির এক ডাকে রাস্তায় নেমে পড়ত হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে রুশ তরুণদের মন জয় করে নিতে পেরেছিলেন নাভালনি। তাকে জনতুষ্টিবাদী নেতা মনে করতেন তারা। তাকে ২০২১ সাল থেকে কারাবন্দী করে রেখেছিল রুশ প্রশাসন। উগ্রপন্থায় উসকানি ও অর্থায়ন এবং একটি উগ্রপন্থী সংগঠন প্রতিষ্ঠার দায়ে নাভালনিকে গত বছরের আগস্টে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় পুতিনের সরকার। সমর্থক ও ভক্তরা নাভালনিকে ‘রাশিয়ার ম্যান্ডেলা’ হিসেবে উল্লেখ করতেন।
আপাদমস্তক দেশপ্রেমীক ছিলেন নাভালনি। ২০২০ সালে একবার তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল রুশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া এলাকা থেকে উড়োজাহাজে যাত্রার সময় ফ্লাইটের ভেতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নাভালনি। তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে উড়োজাহাজে করে বার্লিনে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কোমায় ছিলেন। পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ২০২১ সালে জার্মানি থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন নাভালনি। বলেছিলেন- রাশিয়া আমার দেশ, আমি মাতৃভূমিতে ফিরতে চাই। বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুতিন প্রশাসন। সেই থেকে ছিলেন জেলে।
আজন্ম নির্যাতিত নাভালনির মৃত্যু তার মতাদর্শকে আরও চাঙা করে তুলেছে। তিনি যে আদর্শের প্রচার চালিয়েছেন, তা এখন আরও জোরালো হবে বলে অনেকে মনে করছেন। এমন পূর্বানুমানের পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে বটে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মাত্র ৪৭ বছরের জীবনে নাভালনি যে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, সমর্থক ও অনুসারী রেখে গেছেন, তারাই এখন নাভালনির রেখে যাওয়া কাজকে এগিয়ে নেবেন। তারাই তার আদর্শকে, তার কাজকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন। আর এভাবেই মৃত নাভালনি জীবিত নাভালনির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, নাভালনি শুধু একটি নাম নয়, একটি আদর্শও বটে। তিনি পুতিনের জন্য একমাত্র চ্যালেঞ্জ ছিলেন এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর বিরোধী নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে রাশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলন একটি বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে বটে, কিন্তু কোনো কোনো ধাক্কা ঘুরে দাঁড়ানোরও শক্তি জোগায়। নাভালনির মৃত্যু তার সমর্থকদের মধ্যে শক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। নাভালনির রেখে যাওয়া গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে।
নাভালনির কাজকর্ম নিয়ে বানানো একটি তথ্যচিত্র ২০২২ সালে অস্কার পুরস্কার পেয়েছে। সেই তথ্যচিত্রে দেখা যায়, নাভালনিকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, আপনাকে যদি হত্যা করা হয়, তার আগে আপনি কী বার্তা দিতে চান? জবাবে নাভালনি বলেছিলেন- রুশ সরকার যদি আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমরা তাদের চেয়ে শক্তিশালী। আমাদের এই শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। কখনোই হাল ছাড়া যাবে না, এমনকি আমার মৃত্যু হলেও।