বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার শক্তি, প্রভাব সম্পর্কে কে না জানে! কিন্তু দেশটিতে যে ইসলামের নীরব বিপ্লব ঘটছে সেটা কজনইবা জানেন। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল মুসলমানে ভরে যাচ্ছে। প্রায় জায়গাতেই শোনা যায় আজানের ধ্বনি। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, চলতি শতকের মাঝামাঝিতে রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মুসলিম হয়ে উঠতে পারে। দেশটির রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন মুসলিমরা। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যতম ভরসা এখন মুসলিম কমিউনিটি।
রাশিয়ায় ইসলাম গেল কবে?
দেশটিতে ইসলামের যাত্রা কবে থেকে, এর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের ২২ বছর পর রাশিয়ার মাটিতে ইসলামের আলো পৌঁছায়। বর্তমান রাশিয়ার দাগেস্তান অঞ্চল সর্বপ্রথম মুসলিম শাসনাধীন হয়। এরপর ইতিহাসের নানা পর্যায়ে উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানীয় ও সেলজুক শাসকরা বর্তমান রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় করেন। ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়ান ও তুর্কি বাহিনী রাশিয়ার রাজধানী মস্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। খিলাফত তথা কেন্দ্রীয় মুসলিম শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর রুশ অঞ্চলে একাধিক স্বাধীন মুসলিম রাজ্য গড়ে ওঠে। আঠারো শতকের শুরু থেকে রুশ সাম্রাজ্য প্রতিবেশী এসব রাজ্য দখল করে নেয়।
দেশটিতে বর্তমানে মুসলমান কত?
পরিসংখ্যান বিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটার অনুযায়ী, বিশাল ভূখণ্ডের রাশিয়ায় বর্তমানে জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৪১ লাখ। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের ‘রাশিয়া ২০১৭ ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস রিপোর্ট’র তথ্য মতে দেশটিতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ বা ১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার। ২০২২ সালে রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলমান বলে জানা যায়।
রাশিয়ার মুসলমানদের বিভিন্ন সময় অনেক কষ্টের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর সবচেয়ে খারাপ সময় অতিবাহিত করতে হয়। সে সময় রাশিয়ায় বিদ্যমান ১৫ হাজার মসজিদ ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে পরবর্তী ৭০ বছর পর্যন্ত ইসলামের প্রচার-প্রসার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। রুশ মুসলমানরা ধর্মীয় অনুশাসন ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পালনে বাধার সম্মুখীন হয়।
সোভিয়েত সাম্রাজের পতন দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য স্বস্তি হয়ে আসে। ১৯৯১ সালে ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন পাস হলে ইসলাম তার অন্তর্নিহিত সব শক্তি নিয়ে আবার জেগে ওঠে। বর্তমানে প্রায় ১৫ কোটি রুশ নাগরিকের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। শুধু মস্কোতেই ১০ লাখ মুসলমানের বসবাস। বর্তমানে ইসলাম রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নান্দনিক মসজিদ। সবচেয়ে বড় মসজিদ চেচনিয়া অঞ্চলের শালি শহরে।
চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৪ সালে রাশিয়ায় মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ হবে মুসলিম। ২০৫০ সালের দিকে মুসলমানরা দেশটির অর্ধেক জনসংখ্যা হয়ে যেতে পারে। মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ নেই বর্তমান রুশ প্রশাসনের। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার প্রশাসন রাশিয়াকে আংশিক মুসলিম দেশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। দেশটিতে চালু হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাও।
রাশিয়ার যেসব অঞ্চলে মুসলমানদের বসবাস:
রাশিয়ার একটি স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় প্রাশাসনিক অঞ্চল ইঙ্গোশেটিয়া (Ingoshetia)। ওই এলাকায় সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস। সেখানকার ৯৬ শতাংশ অধিবাসীই মুসলিম। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে চেচনিয়া (Chechnya)। এটিও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। সেখানকার ৯৫ শতাংশ নাগরিক মুসলিম।
দাগেস্তানেও (Dagestan) অসংখ্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। ২০ হিজরিতে ওমর (রা.)’র শাসনামলে সাসানিদের পরাজিত দাগেস্তানের বাবুল আবওয়াব শহর জয় করেন সাহাবি সুরাকা ইবনে আমর (রা.)। এরপর থেকে দাগেস্তান ওই অঞ্চলে ইসলামের দুর্গ হিসেবেই ভূমিকা পালন করে আসছে। দাগেস্তানের জনসংখ্যার ৮২.৬০ শতাংশ মুসলিম। চের্কেসিয়া অঞ্চলের জনসংখ্যার ৬৪.২ শতাংশ মুসলিম। এছাড়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর মধ্যে আছে বাশকোরতুস্তান (Bashkortostan), কাবার্ডিনো-বালকারিয়া ও তাতারস্তান।
রাশিয়ার প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বরা:
রুশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, ক্রীড়া প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অন্যতম রাভিল ইসমাগিল উলি গাইনুৎদিন (Rawil Ğaynetdin)। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তি একজন ধর্মতাত্ত্বিক, ইমাম ও মুফতি।
রাজনীতির অঙ্গনে আলোচিত মুসলিম ব্যক্তিত্ব মিন্তিমের শারিপ উলি শাইমিয়েভ (Mintimer Shaimiev)। তিনি ছিলেন তাতারস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান। ১৯৯১ সালে তিনি তাতারস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন এবং তার শাসনামলে অনুষ্ঠিত একটি গণভোটে তাতারস্তান স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকার সিদ্ধান্ত নেন শাইমিয়েভ।
ক্রীড়া ক্ষেত্রে রাশিয়ার উজ্জ্বল এক উদাহরণ খাবিব আব্দুলমানাপোভিচ নুরমাগোমেদভ (Khabib Nurmagomedov)। তিনি একজন মিক্সড মার্শাল আর্ট ফাইটার। তাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মিক্সড মার্শাল আর্ট ফাইটারদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি ইউএফসি লাইটওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন এবং ২৯টি ম্যাচের প্রতিটিতে বিজয়ী হন। ২০২০ সালে অপরাজিত অবস্থায় মিক্সড মার্শাল আর্ট থেকে অবসর নেন খাবিব।
রমজান কাদিরভের কথা কে না জানে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় থেকে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় চলে আসেন তিনি। কাদিরভ রাজনীতিবিদ ও আধাসামরিক কর্মকর্তা। তার বাবা ছিলেন চেচনিয়ার প্রধান মুফতি। বাবার সঙ্গে প্রথম চেচেন যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধ শুরু হলে কাদিরভ পরিবার রুশ সরকারের পক্ষে যোগদান করে এবং রমজান কাদিরভের বাবা আখমাদ কাদিরভ চেচনিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হন। ২০০৪ সালে আখমাদ কাদিরভ চেচেন মিলিট্যান্টদের হাতে নিহত হলে রমজান কাদিরভ চেচনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধান নিযুক্ত হন। রাজনৈতিকভাবে কাদিরভ রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রমজান কাদিরভ একজন যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবে পরিচিত।
রাশিয়ার বিলিয়নিয়ার এক মুসলিম ব্যবসায়ী হলেন আলিশের বুরহনোভিচ উসমনভ (Alisher Burkhnovich Usmanov)। বর্তমানে তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের মধ্যে ৮৩তম। তার সম্পত্তির পরিমাণ ১৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। উসমনভ রুশ টেলিকম কোম্পানি মেগাফোন, ইন্টারনেট কোম্পানি মেইলরু এবং সংবাদপত্র কমেরসান্ত-এর মালিক এবং বৈশ্বিক কোম্পানি ইউএসএম হোল্ডিংস-এর প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন সেবামূলক কাজেও জড়িত তিনি। এ ছাড়া রাশিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলো ছড়ানো অনেক মুসলিম রয়েছেন।