ডলারের দাম বাড়ায় আমদানিকারকেরা দিশেহারা 

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ১১:২৪ এএম

গত দুই বছর দেশের বাজারে ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ধীরে-ধীরে ডলারের দাম বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু গত সপ্তাহ হঠাৎ করে একশ দশ টাকা থেকে এক লাফে ডলারের দাম ১১৭ টাকা বাড়ানোয় উভয় সংকটে পড়েছেন দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকেরা। বিশেষ করে যারা আমদানিকারক তারা পড়েছেন বেশ বিপাকে। দাম বাড়ায় ডলার সংকট এলসি খুলতে বেগ পেতে হচ্ছে অনেকের। ফলে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর অধিকাংশ পণ্যের দাম এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। যাদিও অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন ডলারের দাম বাড়ার সাথে সাথে দ্রব্যমূল্য বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তারা বলছেন, এই মূহর্তে বাজারে যেসব পণ্য রয়েছে তা ডলারের মূল্য বাড়ার আগেই আনা। নতুন ডলারের দামে এলসি খুলে সেই পণ্য দেশে আসার পর দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বিনিময় হার নির্ধারণের ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালু করায় আপতত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে দেশে ডলারের দাম কখনও একসঙ্গে এতটা বাড়েনি। ফলে আরও চাপ তৈরি হতে পারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামের ওপর। কারণ ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত দরে ডলার কিনলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো পণ্য আমদানিতে এতো দিন ১১০ টাকা দামে ডলার দিত বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডলারের দাম বাড়ানোর ঘোষণায় এফবিসিসিআই’র সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ডলারের দর বৃদ্ধি রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের জন্য ভালো। তবে আমদানিতে খরচ বাড়বে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজর রাখতে হবে আগের মতো আবার যেন ডলার ১২৪ থেকে ১২৫ টাকায় উঠে না যায়।

এদিকে নির্ধারিত ১১৭ টাকা দামেও এলসি খুলতে পারছে না আমদানিকারকরা। খোলাবাজার থেকে ১২৫ টাকায় ডলার কিনতে হচ্ছে তাদের। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এ দামেও ডলার পাচ্ছেন না। বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের সাথে সুসম্পর্ক থাকায় এলসি খুলে আমদানি করতে পারছেন। এক্ষেত্রে ক্ষুদ ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়েছে বলেও জানান কয়েকজন ব্যবসায়ী।

এ বিষয়ে কথা হয় মোবাইল এক্সসরিজ আমদানিকারক মোল্লা এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী জসিম মোল্লার সাথে। তিনি খবর সংযোগকে বলেন, প্রায় দশ বছর ধরে মোবাইল এক্সেসরিজ আমদানি করছি। এতটা চাপে কখনও পড়িনি। গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করেও এলসি খুলতে পারছি না। খোলা বাজার থেকে ডলার কিনতে হয় সরকার নির্ধারিত দামের থেকে ৭-৮ টাকা বেশি। ডলারের দামের এ পার্থক্যের কারণে আমদানি করলেও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে পারব না। 

তিনি বলেন, অনেকের সাথে ব্যাংকের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তারা এলসি খুলে কিছু-কিছু পণ্য আমদানি করছেন। মার্কেট এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। যারা নতুন কিংবা খোলাবাজার থেকে যাদের ডলার কিনতে হচ্ছে তাদের অবস্থা খুব খারাপ। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত থেকে চাল আমদানি করে বিপাকে পড়েছেন নওগাঁর ধান-চাল ব্যবসায়ীরা। লেটার অব ক্রেডিট বা এলসির মাধ্যমে চাল আমদানি করতে গিয়ে বিপুল লোকসানের আশঙ্কায় ভারত থেকে আপাতত চাল আনা বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ডলারের দাম স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তারা ভারত থেকে চাল আনবেন না। ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে চাল আমদানিতে নিরুৎসাহী হয়ে পড়েছেন।

নতুন করে ডলারের দাম বাড়ায় দেশের রপ্তানিকারকরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান। তিনি বলেন, দেশে ডলার সংকট এখনও কাটেনি। উল্টো নতুন করে ডলারের দাম বেড়েছে। এতে রপ্তানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এখন ডলারপ্রতি বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১৭ টাকারও বেশি গুনতে হচ্ছে রপ্তানিকারকদের। ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারভিত্তিক না হওয়ায় এ সমস্যা হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশে যেসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে শিগগিরই এই ডলার সমস্যার সমাধান হবে না, যদি না আমরা রেমিট্যান্স ও এক্সপোর্ট গ্রোথ বাড়াতে পারি। পাশাপাশি মাল্টিল্যাটারাল অ্যাসিস্ট্যান্স যাতে পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে, যেগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা আমদানি-নির্ভর। দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের অর্থনীতি চাপে আছে। এখন হঠাৎ করেই ডলারের দাম খুব বেশি হলে এর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে। বিশেষ করে আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। এতে পণ্যের দামও বাড়াতে বাধ্য হবেন আমদানিকারকরা। চাপে পড়বেন সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে, মানুষ কষ্ট পাবে।

বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে ২০২২ সালের মার্চ থেকে ব্যাপক হারে দেশে মার্কিন ডলারের মূল্য বাড়তে শুরু করে। ২০২২ সালের ৩০ মার্চ ডলারের অফিশিয়াল দাম ছিল ৮৬.২০ টাকা। সেখান থেকে বেড়ে এখন ১১৭ টাকায় উঠেছে। ২৫ মাসের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে ৩৭.৬৪ শতাংশ।

AST
আরও পড়ুন