মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা ‘এস্তাদিও আজতেকা’ (Estadio Azteka) শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের জীবন্ত এক অধ্যায়।
১৯৬৬ সালে উদ্বোধনের পর থেকে এই মাঠ যুগে যুগে কিংবদন্তি ফুটবলারদের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী হয়েছে। ফুটবল সম্রাট পেলে থেকে শুরু করে ফুটবলের ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা—বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর সিংহভাগেরই জন্ম এই পুণ্যভূমিতে।
এস্তাদিও আজতেকার ইতিহাস ও পরিচিতি
মেক্সিকো সিটির কোয়োআকানে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি জনপ্রিয় মেক্সিকান ক্লাব আমেরিকা এবং মেক্সিকো জাতীয় ফুটবল দলের অফিসিয়াল হোম ভেন্যু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার (৭,২০০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের বর্তমান ধারণক্ষমতা ৮৭,৫২৩। এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল স্টেডিয়াম।
১৯৬৮ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রধান ভেন্যু ছিল এই মাঠ। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে নারী বিশ্বকাপও এখানে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
যেখানে ইতিহাস গড়েছিলেন পেলে ও ম্যারাডোনা
বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ও আইকনিক ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোর অন্যতম এস্তাদিও আজতেকা। এটিই ইতিহাসের প্রথম স্টেডিয়াম, যা দুটি ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন করেছে:
১৯৭০ বিশ্বকাপ ফাইনাল: এখানে ব্রাজিল ৪-১ গোলে ইতালিকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং পেলে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে।
এক অনন্য রেকর্ড: বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এস্তাদিও আজতেকাই একমাত্র স্টেডিয়াম, যেখানে পেলে (১৯৭০) এবং দিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬)—দুই সর্বকালের সেরা ফুটবলারই তাঁদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন।
এ ছাড়া ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের সেই বিখ্যাত ম্যাচটিও এখানেই হয়েছিল, যেখানে ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ (হাতের গোল) এবং অবিশ্বাস্য ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ উপহার দিয়েছিলেন।
১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ইতালির পশ্চিম জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারানো ঐতিহাসিক ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’ ম্যাচটিও এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
নির্মাণ ও ঐতিহাসিক উদ্বোধনী ম্যাচ
১৯৬৮ অলিম্পিক সামনে রেখে তৎকালীন মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট আদোলফো লোপেস মাতেওসের আমলে এই মেগা স্টেডিয়ামটির পরিকল্পনা করা হয়। স্থপতি পেদ্রো রামিরেস ভাসকেস এবং রাফায়েল মিজারেস আলকেরেকার নকশায় ১৯৬১ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
উদ্বোধন: ১৯৬৬ সালের ২৯ মে ক্লাব আমেরিকা ও ইতালির তোরিনো এফসির মধ্যকার ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ দিয়ে স্টেডিয়ামটির যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন দর্শক ধারণক্ষমতা ছিল ১,০৭,৪৯৪ জন।
প্রথম গোলদাতা: স্টেডিয়ামের ইতিহাসে প্রথম গোলটি করেন ব্রাজিলিয়ান আরলিন্দো দস সান্তোস।
প্রথম মেক্সিকান গোলদাতা: ১৯৬৬ সালের ৫ জুন আধুনিক ফ্লাডলাইট উদ্বোধনের পর স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়ার মুখোমুখি হয় নেকাক্সা। সেই ম্যাচে নেকাক্সার রবার্তো মার্তিনেজ (কানিয়া ব্রাভা) প্রথম মেক্সিকান হিসেবে এই মাঠে গোল করার গৌরব অর্জন করেন।
খেলাধুলার বাইরে: সংগীত ও রাজনৈতিক মঞ্চ
ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি বড় বড় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু এই এস্তাদিও আজতেকা। ১৯৯৩ সালে কিং অব পপ মাইকেল জ্যাকসন এখানে টানা পাঁচটি হাউজফুল কনসার্ট করেন। এ ছাড়া ইউটু (U2), পল ম্যাককার্টনি, এলটন জন, লুইস মিগেল এবং দ্য থ্রি টেনরসের মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা এখানে পারফর্ম করেছেন। ১৯৯৯ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয়-এর মেক্সিকো সফর এবং ২০০৬ সালে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ফেলিপে কালদেরনের নির্বাচনী প্রচারণার সমাপনী অনুষ্ঠানও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
নাম বদলের বিতর্ক ও নতুন রূপ
‘আজতেকা’ নামটি মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী ‘অ্যাজটেক’ সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাখা হয়। বর্তমানে স্টেডিয়ামটির মালিকানায় রয়েছে মেক্সিকান মাল্টিমিডিয়া জায়ান্ট টেলেভিসা।
এর বিশাল কাঠামোর কারণে স্থানীয়ভাবে একে ‘কলোসো দে সান্তা উরসুলা’ (সান্তা উরসুলার দৈত্য) নামেও ডাকা হয়।
১৯৯৭ সালে সাবেক ফুটবল সভাপতি গিয়ের্মো কানিয়েদোর সম্মানে এর নাম ‘এস্তাদিও গিয়ের্মো কানিয়েদো’ রাখা হলেও দর্শকের আপত্তিতে তা পরিবর্তন করা হয়।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ বানোর্তে ব্যাংক স্টেডিয়ামের নামকরণের স্বত্ব কিনে নিলে এর নাম হয় ‘এস্তাদিও বানোর্তে’। তবে ফিফার করপোরেট স্পন্সরশিপ নীতিমালার কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামটি অফিসিয়ালি ‘মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম’ নামে পরিচিত হবে।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ও সংস্কার কাজ
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এক অনন্য ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে এস্তাদিও আজতেকা। এটিই পৃথিবীর একমাত্র স্টেডিয়াম, যা তিনটি পৃথক ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) আয়োজন করার গৌরব অর্জন করছে। ২০২৪ সালের মে মাসে মেগা টুর্নামেন্টটির জন্য স্টেডিয়ামটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে ব্যাপক সংস্কার করা হয়।
সংস্কারের আওতায় এর আসন সংখ্যা বৃদ্ধি (৮৭,৫২৩), অত্যাধুনিক হাইব্রিড টার্ফ স্থাপন, উন্নত মানের এলইডি স্ক্রিন ও লাইটিং এবং নতুন ড্রেসিংরুম তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের ২৮ মার্চ মেক্সিকো ও পর্তুগালের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচ (০-০ ড্র) দিয়ে স্টেডিয়ামটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়।
গুলশানে গাছের ডাল ভেঙে আটকে পড়া ৪ সাংবাদিককে উদ্ধার করলো পুলিশ
মালদ্বীপে গুহা থেকে নিখোঁজ ৪ ইতালিয় পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার
পশ্চিমবঙ্গে চরম বিপাকে হিন্দু খামারিরা, আত্মহত্যার হুমকি
কেরালার ২০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ৬ মুসলিম