একসময় ‘স্কার্ট পরা পেলে’ নামে পরিচিত মার্তা দা সিলভার নাম আজ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একাই উজ্জ্বলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মার্তা এবং নারী ফুটবল এই দুটি শব্দ এখন প্রায় সমার্থক।
ব্রাজিলে ১৯৮৬ সালে নারীদের ফুটবল খেলার ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, যা মার্তার জন্মের মাত্র ছয় বছর আগে। ৯০-এর দশকে যখন তিনি ফুটবল শুরু করতে চান, তখন মেয়েদের কোনো দলই ছিল না। ফলে তিনি রাস্তায় মুড়ি-চিপসের ব্যাগ গুছিয়ে বল বানিয়ে খেলতেন আলাগোয়াসের রাস্তায়।
শুরুর সংগ্রাম ও উত্থান
কঠিন সেই বাস্তবতার মধ্যেই মার্তা নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন। তিনি স্থানীয় একটি ছেলেদের দলে খেলেন এবং পরে স্কাউটদের নজরে পড়ে রিও ডি জেনেইরোর একটি নারী দলে যোগ দেন।
২০০৪ সালে তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান এবং সুইডেনের ইউমেয়া আইকে ক্লাবে চার বছরে ১০৩ ম্যাচে ১১১ গোল করে বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন তোলেন। এরপর তার ক্লাব ক্যারিয়ার তাকে বিশ্বের নানা প্রান্তে নিয়ে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এনডব্লিউএসএল ক্লাব অরল্যান্ডো প্রাইডে স্থায়ী হন।
স্কার্ট পরা পেলে
মাত্র ২১ বছর বয়সে প্যান আমেরিকান গেমসে ৬৮,০০০ দর্শকের সামনে খেলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র অনূর্ধ্ব-২০ দলকে হারান। সেখান থেকেই তিনি ‘স্কার্ট পরা পেলে’ নামে পরিচিতি পান। এমনকি ফুটবল কিংবদন্তি পেলে নিজে তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান।
২০০৭ নারী বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে মার্তা বড় ভূমিকা রাখেন। দলটি ফাইনালে পৌঁছালেও জার্মানির কাছে পরাজিত হয়। তবে মার্তা টুর্নামেন্টে গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট জিতে নেন।
২০১১ সালে নেইমার তাকে ‘অসাধারণ ও অসামান্য’ বলে প্রশংসা করেন এবং বলেন, তিনি নারী দলের জন্য ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা রোনালদো পুরুষ দলের জন্য।
রেকর্ড ও অর্জন
মার্তা ইতিহাস গড়েন একাধিকবার
* পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়
* বিশ্বকাপে মোট ১৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা
* টানা পাঁচটি অলিম্পিকে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় (মোট ১৩ গোল)
তার দীর্ঘ ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তাকে নারী ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শেষ অধ্যায় ও বিদায়
২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক ছিল তার ষষ্ঠ ও শেষ অংশগ্রহণ। স্পেনের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার কারণে তিনি কোয়ার্টার ও সেমিফাইনালে খেলতে পারেননি। তবে তার অনুপস্থিতিতেও ব্রাজিল সেমিফাইনালে স্পেনকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায়।
মিডফিল্ডার অ্যাঞ্জেলিনা বলেন, “মার্তা ছাড়া এই জয় আমরা তার জন্যই পেয়েছি।”
অলিম্পিকের ফাইনাল ম্যাচের পর মার্তা নিশ্চিত করেন যে এটিই ছিল তার শেষ বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা।
তিনি বলেন, “এটি অবশ্যই আমার শেষ অলিম্পিক ছিল। আমি মনে করি না আমাকে আর বিশ্বকাপ বা কোনো বড় টুর্নামেন্টে দেখা যাবে। তবে আমি কখনো ফুটবল থেকে দূরে থাকব না।”
তিনি আরও বলেন, ১৪ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে ফুটবলের স্বপ্নে এগিয়ে যাওয়ার পথ সহজ ছিল না, কিন্তু আজ নারীদের ফুটবলের অবস্থার পরিবর্তনে তিনি গর্বিত।
ভক্ত, সতীর্থ এবং প্রতিপক্ষ সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে বিদায় নেন মার্তা। তার ক্যারিয়ার শুধু রেকর্ডের গল্প নয়, বরং নারীদের ফুটবলের পথ তৈরি করার ইতিহাস।
মার্তা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন নারী ফুটবলের এক অনন্য কিংবদন্তি হিসেবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এমবাপ্পের নতুন ইতিহাস
অনবদ্য মেসি, অবিশ্বাস্য এক মহাকাব্যের নাম
২৮ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে নরওয়ে
এমবাপের জোড়া গোলে ইরাককে হারালো ফ্রান্স