ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের কারণে প্রায় তিন বছর বন্ধ থাকার পর আবারও মাঠে ফিরেছে ফিলিস্তিনের ঘরোয়া ফুটবল।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএফএ) জানিয়েছে, শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
ফিলিস্তিনি ফুটবলের এই প্রত্যাবর্তন শুরু হয়েছে বিশেষ এক টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ’। পিএফএ সভাপতি জিবরিল রাজুব জানিয়েছেন, যুদ্ধের সময় নিহত খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি ও ক্রীড়া কর্মকর্তাদের স্মরণে এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে।
পিএফএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনি ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পিএফএর এক কর্মকর্তা আনাদোলু এজেন্সিকে জানিয়েছেন, এ সময়ে ১ হাজার ১৪ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ফুটবলার, কোচ, রেফারি ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
ফুটবলের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনি ক্রীড়া কর্মকর্তাদের হিসাবে, গাজায় ৫০টির বেশি ক্রীড়া ক্লাব এবং বিপুলসংখ্যক মাঠ ও ক্রীড়া স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ফলে যুদ্ধের মধ্যেও ফুটবল পুনরায় চালু করতে গিয়ে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে আয়োজকদের।
তবু মাঠে ফেরার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা। পিএফএ সভাপতি জিবরিল রাজুব বলেছেন, যুদ্ধ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা তাদের জাতীয় ইচ্ছাশক্তি কিংবা খেলাধুলাকে আশা ও জীবনের প্রতীক হিসেবে দেখার বিশ্বাস হারায়নি।
পিএফএর ঘোষণায় বলা হয়েছিল, পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে থাকা ক্লাবগুলো এই পুনরারম্ভের অংশ হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারী ক্লাবের সংখ্যা ২০০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গাজার ক্লাবগুলোকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও সীমিত সুযোগ-সুবিধায় প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
গাজায় ফুটবল মাঠের সংকট কতটা তীব্র, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় সাম্প্রতিক প্রস্তুতিতে। সেখানে কিছু ক্লাব ধ্বংসস্তূপঘেরা ছোট কৃত্রিম টার্ফের মাঠে অনুশীলন করছে। অনেক খেলোয়াড় বাস্তুচ্যুত হওয়ায় তাদের নিয়মিত অনুশীলনে অংশ নেওয়া এবং ম্যাচে যাতায়াত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের সময় শুধু মাঠ ও ক্লাবই ধ্বংস হয়নি; হারিয়ে গেছেন বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড়ও। পিএফএর হিসাবে নিহতদের মধ্যে কয়েক শত ফুটবলার রয়েছেন। সম্প্রতি জাবালিয়া সার্ভিসেস ক্লাবের খেলোয়াড় আবদেল ফাত্তাহ আবু আল-আইশ নিহত হওয়ার ঘটনাও ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে শোকের ছায়া ফেলেছে। তিনি ‘থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ’-এ অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে পিএফএর কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনি ফুটবলের এই প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি দেশটির ক্রীড়াঙ্গনও পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। গাজায় অঙ্গহানি হওয়া খেলোয়াড়দের নিয়েও ফুটবল কার্যক্রম চালু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ ও সীমিত সরঞ্জামের মধ্যেও তারা খেলাধুলাকে মানসিক পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে প্রতিযোগিতা শুরু হলেও সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে—এমন নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মাঠের স্বল্পতা, সরঞ্জামের সংকট, খেলোয়াড়দের বাস্তুচ্যুতি এবং চলমান হামলা—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনি ফুটবলের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু প্রায় তিন বছর পর বল আবার মাঠে গড়ানোকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ক্রীড়াঙ্গনের পুনর্জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ফুটবলের প্রত্যাবর্তন তাই ফিলিস্তিনের জন্য শুধু খেলা নয়—এটি হারানো মানুষদের স্মরণ, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও টিকে থাকার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইরান যুদ্ধের তথ্য ফাঁস: মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষার মুখোমুখি ৫০ কর্মকর্তা
সাইপ্রাসে ফেরি দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২, নিখোঁজ ১৬
বিশ্ব মানচিত্রে বড় হচ্ছে আফ্রিকা, জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস