এআইকে পেছনে ফেলে আসছে 'এজিআই', বদলে যাবে পৃথিবী

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

চলতি দশকের শেষ নাগাদ অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যেই মানুষের সমকক্ষ বা মানুষকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স  ‘এজিআই’ (AGI) বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে মনে করেন গুগল ডিপমাইন্ডের সিইও এবং ২০২৪ সালের রসায়নে নোবেলজয়ী ডেমিস হাসাবিস।

সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব বিজনেসের এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, এজিআই আসার সম্ভাব্য সময় হতে পারে “২০৩০ সাল, এর থেকে এক বছর কম বা বেশি।”

হাসাবিস এই প্রযুক্তিকে এতটাই পরিবর্তনকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে, এর আগমনকে একটি ‘নতুন মানব যুগের’ সূচনা বলে মনে হতে পারে। তার মতে, সমাজ বর্তমানে ‘সিঙ্গুলারিটি’ বা প্রযুক্তিগত রূপান্তরের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে, যা মানুষের জীবন ও কাজের ধরনকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় নেই।” আগামী কয়েকটি বছর মানবজাতি এই প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান এআই (AI) বনাম এজিআই (AGI)

বর্তমানে আমরা চ্যাটজিপিটি (ChatGPT), মিডজার্নি (Midjourney) বা আলফাফোল্ডের মতো যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছি, সেগুলোকে বলা হয় ন্যারো এআই (Narrow AI)। এগুলো কেবল নির্দিষ্ট কিছু কাজ— যেমন টেক্সট লেখা, ছবি তৈরি বা ডেটা অ্যানালাইসিস করতে পারে।

কিন্তু এজিআই হবে এর চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। এটি কোনো সুনির্দিষ্ট কাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একজন মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে একই সাথে যুক্তি খণ্ডন করতে পারে, নতুন ভাষা শিখতে পারে, জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে; এজিআই ঠিক একইভাবে মানুষের চেয়েও দ্রুত ও নিখুঁতভাবে সব কাজ একাই করতে পারবে। সহজ কথায়, এটি হবে মানুষের মতনই স্বাধীন চিন্তাশক্তিসম্পন্ন এক মহাশক্তিশালী ডিজিটাল মস্তিষ্ক।

এজিআই আসার পর ডিজাইনারদের ভবিষ্যৎ কী?

এজিআই-এর এই ঝোড়ো গতিতে এগিয়ে আসার খবরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্রিয়েটিভ সেক্টর, বিশেষ করে গ্রাফিক্স ও ইউআই/ইউএক্স (UI/UX) ডিজাইনারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এজিআই আসার পর ডিজাইনারদের কাজের ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন আসবে:

কাজের গতি ও অটোমেশন: বর্তমানে একজন ডিজাইনারের যে লোগো বা ওয়েবসাইট লেআউট তৈরি করতে কয়েক দিন সময় লাগে, এজিআই তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে কোটি কোটি ভ্যারিয়েশনে তৈরি করে দিতে পারবে। ফলে সাধারণ ও এন্ট্রি-লেভেলের ডিজাইনিংয়ের কাজগুলো সম্পূর্ণভাবে এজিআই-এর দখলে চলে যাবে।

দক্ষতার নতুন সংজ্ঞা: যারা শুধু টুলস (যেমন- ফটোশপ বা ইলাস্ট্রেটর) চালনায় দক্ষ, তাদের টিকে থাকা কঠিন হবে। তবে এজিআই আসার মানেই ডিজাইনারদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি নয়। বরং যারা ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘ক্রিয়েটিভ ডিরেকশন’ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝায় পারদর্শী, তারা এজিআই-কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে আরও নিখুঁত ও অবিশ্বাস্য সব ডিজাইন তৈরি করতে পারবেন।

ডিপমাইন্ডের শুরু ও ‘আলফাগো’র ঐতিহাসিক জয়

২০১০ সালে ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠার পেছনের উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ— ‘ধাপ এক: বুদ্ধিমত্তার সমাধান করা। ধাপ দুই: এটি ব্যবহার করে অন্য সবকিছুর সমাধান করা।’ হাসাবিস স্মরণ করেন, শুরুর দিকে তাদের এআই সিস্টেমগুলো স্ক্রিনের পিক্সেল দেখে ক্লাসিক ‘পং’ (Pong) গেম খেলতেও ব্যর্থ হতো। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা টানা জিততে শুরু করে।

এই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে তৈরি হয় ‘আলফাগো’, যা তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন লি সেডলকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়ে। হাসাবিসের মতে, সেই বিজয়টি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট, যা প্রমাণ করেছিল যে এআই মানুষের অজানা সম্পূর্ণ নতুন আইডিয়া ও কৌশল তৈরি করতে সক্ষম।

নোবেল জয় ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লব

গেমের জগৎ ছাড়িয়ে এআই-কে বাস্তব বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে রূপ দেয় ডিপমাইন্ডের প্রোটিন গঠন পূর্বাভাসের সিস্টেম ‘আলফাফোল্ড’। জীববিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য প্রোটিন ফোল্ডিংয়ের সমাধান করায় ২০২৪ সালে ডেভিড বেকার এবং জন জাম্পারের সাথে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ডেমিস হাসাবিস।

আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

এজিআই নিয়ে আশাবাদী হলেও হাসাবিস স্বীকার করেছেন যে, এআই নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগগুলো একেবারেই যৌক্তিক। তিনি এআই-কে একটি শক্তিশালী ‘দ্বিমুখী ব্যবহারের’ প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা যেমন বিপুল সুবিধা আনবে, ঠিক তেমনি প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং দার্শনিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যাঘাত বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে এই আলোচনা কেবল প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতিবিদ, নীতি-নির্ধারক, সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সাথে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি এআই-কে ভয় না পেয়ে একে আপন করে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

YA
আরও পড়ুন