আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমলেও উল্টো চিত্র দেশে

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০২ পিএম

বিশ্ববাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশের বাজারে প্রধান প্রধান নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে রমজান মাস সামনে রেখে ছোলা ও খেজুরসহ কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং এক বছরে ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে চাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা ও খেজুরের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাস ও এক বছরের ব্যবধানে দামের পার্থক্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান মাসে এসব পণ্যের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক মাসে দেশে স্বর্ণা ও চায়নাসহ মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে এই চালের দাম ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে প্রতি কেজি ৫৪ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরে এই চালের দাম ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে প্রতি টন ৪২৩ মার্কিন ডলারে নেমেছে। যদিও এক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে এই মানের চালের দাম ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং এক বছরে ১২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ কমেছে। এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে এ পণ্যের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ২৭ শতাংশ। 

একই সময়ে বাংলাদেশের বাজারে পাম অয়েলের দাম সামান্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে তা ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ কমেছে।

মাঝারি ও ছোট দানার মসুর ডালের দাম এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে বেড়েছে। তবে মোটা দানার মসুর ডালের দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং ভারতে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ হারে মসুর ডালের দাম কমেছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা মূলত এই দুটি দেশ থেকেই মসুর ডাল আমদানি করে থাকেন।

গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত চিনির দাম ৫ শতাংশ বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ১ দশমিক ২০ শতাংশ বাড়লেও গত এক বছরে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই প্রায় ১৫ শতাংশ হারে দাম কমেছে।

পেঁয়াজের দামে কিছুটা স্বস্তির তথ্য পাওয়া গেছে প্রতিবেদনে। গত এক মাসে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ কমেছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে এ পণ্যের দাম ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে দেশে নতুন পেঁয়াজ ওঠার মৌসুম শুরু হওয়ায় দাম কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া আদা, রসুন ও ছোলার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে বেশি কমেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রমজান মাসে এই তিনটি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।

রমজান মাসে বাংলাদেশের বাজারে খেজুরের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ইফতারে খেজুর একটি অপরিহার্য খাদ্যপণ্য। গত এক মাসে দেশের বাজারে আমদানিনির্ভর এ পণ্যের দাম ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে মানভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খেজুরের দামের বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্বল বাজার তদারকি, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার দরপতনের কারণে বাংলাদেশের বাজারে অনেক পণ্যের দাম কমার সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের দুর্বৃত্তায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার সুফল পান না। সরকারের বাজার মনিটরিংও দুর্বল।’

তিনি বলেন, ‘যেখানে মনিটরিং হয়, সেখানেও অনেক সময় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ব্যবসায়ীরা ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখালেও বাস্তবে এর প্রভাব খুব বেশি নয়, কারণ ডলারের দাম বেশ কিছুদিন ধরে স্থিতিশীল রয়েছে।’

এ পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাব উদ্বিগ্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে টাস্কফোর্সের বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, আসন্ন রমজানে কিছু কিছু পণ্যের দাম কমবে। গত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি হওয়ায় এবারের রমজান গতবারের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে।

তিনি বলেন, বাজারের সরবরাহ, আমদানি ও উৎপাদনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছরের রমজানে বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকবে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, টাস্কফোর্সের সভায় রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন। আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাম বাড়বে না, বরং কিছু কিছু পণ্যের দাম আরও কমবে।

গত বছরের তুলনায় এবার নিত্যপণ্যের আমদানি ৪০ শতাংশ বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এবারের রমজানে নিত্যপণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে।’

এ সময় বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা রমজানে পণ্য সরবরাহ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করলেও সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় এবছর রমজান মাসে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সভায় জানানো হয়, রমজান মাসে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ১ লাখ ৮ হাজার টন সয়াবিন তেল এবং ২ লাখ ৫৮ হাজার টন পাম অয়েলসহ মোট ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল মোট ৩ লাখ ৭২ হাজার টন।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলিয়ে মোট ৩ লাখ ৯২ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণপত্র (এলসি) খুলেছেন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪ লাখ ৫১ হাজার টন।

আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে রোজা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির জন্য খোলা এলসির বিপরীতে পণ্য ফেব্রুয়ারিতে বাজারে সরবরাহ হবে। 

তবে আগের বছরের তুলনায় কম পরিমাণ এলসি খোলায় বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহও কম হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

AHA
আরও পড়ুন