মায়া ও ড্যানিয়েল নামের দুই ব্যক্তি বেসরকারি সংস্থা ‘গ্লোবাল লিংক’- এর কার্যালয়ের একটি কক্ষে বসে আছেন। ৮ জানুয়ারি দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে তারা ইরান থেকে তাদের পরিবার বা বন্ধুদের কোনো খবর পাচ্ছিলেন না।
মায়া ও ড্যানিয়েল দুজনেই আলাদাভাবে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। মায়া তেহরানের কাছের একটি শহর থেকে ছয় বছর আগে পড়তে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। ড্যানিয়েল উত্তর-পশ্চিম ইরানের সিনে থেকে তিন বছর আগে সহায়তাকর্মী হিসেবে এ দেশের এসেছেন। তাদের উভয়ের পরিবার এখনো ইরানে।
মায়া এখনো তেহরানের উপকণ্ঠে থাকা তার বয়স্ক মা–বাবার কোনো খবর পাননি। ড্যানিয়েল জানেন না ক্যানসারে আক্রান্ত তার অসুস্থ বাবা বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন।
২৮ ডিসেম্বর ইরানের মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর ব্যাপক দরপতনের পর থেকে দেশটিতে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তাতে কত মানুষ নিহত হয়েছেন, সে সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তেহরানের বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রথম রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যা পরে পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি স্বীকার করেন, এই অস্থিরতায় ‘কয়েক হাজার’ মানুষ নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন। সরকার বিক্ষোভকারীদের অর্থনৈতিক কষ্টের কথা স্বীকার করে তা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বলেছে, সরকারি ভবনে হামলা চালানো এই বিক্ষোভ পরে ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘বিদেশি শক্তি’র মদদপুষ্ট ব্যক্তিদের হাতে চলে গেছে।
ড্যানিয়েল বলেন, ‘আমি খুব মানসিক চাপে আছি।’ ছাত্রজীবনে গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন করে কারাভোগ করা ড্যানিয়েল বলেন, ইন্টারনেট বন্ধের আগেই তার অনেক বন্ধুকে গ্রেপ্তারের খবর তিনি পেয়েছিলেন।
এর আগেও মায়া ও ড্যানিয়েল ইরানে অস্থিরতা দেখেছেন। তবে তারা মনে করেন, এবারের বিক্ষোভ ইরানের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। মায়া বলেন, ‘আমার মনে হয়, এবার আগের মতো নয়...কারণ, অর্থনীতি ধসে পড়েছে।’
মায়া সমাজের সেসব মানুষকে ‘পরাজিত’ বলে বর্ণনা করেন, যাঁরা তাদের পরিবারের জন্য এক বেলার খাবারও জোগাড় করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘তারা ক্লান্ত, পরিবারের সামনে লজ্জিত হতে হতে তারা বিরক্ত। রাস্তায় মিছিলে গিয়ে না মরলেও হয়তো আগামী এক বছর বা ছয় মাসের মধ্যে তারা না খেয়েই মারা যাবেন।’
ইরানে মুদ্রাস্ফীতির হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। রিয়ালের পতনের আগেও মুদ্রাস্ফীতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির অর্থনীতি ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে।
মায়া তার পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা মনে করে বলেন, তেহরানের মেট্রোস্টেশনে তিনি এক মধ্যবয়সী নারীকে কিছু একটা বিক্রির চেষ্টা করতে দেখেছিলেন। সে সময় পাশে থাকা কিশোরী মেয়েটি তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আর সেই নারী লজ্জায় কাঁপছিলেন। মায়া বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম, ওই নারী প্রথমবারের মতো এমন কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং তিনি খুব অপমানিত বোধ করছিলেন।’
মায়া ও ড্যানিয়েল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় থাকা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ইরাকের কুর্দিস্তানের ইরবিলে ড্যানিয়েলের এক বন্ধু আছেন, যিনি মাঝেমধে৵ ইরানের মানুষের সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য কথা বলতে পারছেন।
ড্যানিয়েলের ওই বন্ধু তাকে জানিয়েছেন, তারা কিছু অসমর্থিত গুজবও শুনেছেন। যেমন রাস্তায় মিলিশিয়া বাহিনী পাহারা দিচ্ছে এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ তিন হাজার মার্কিন ডলার (একটি গুলির দাম হিসেবে) দাবি করছে।
ইরানের শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভি আবার ক্ষমতায় ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন- এমন খবরও তারা শুনেছেন। তবে তারা এই রাজপরিবারকে ‘পুরোনো আবর্জনা’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বাড়ির খবরের অপেক্ষায় মায়ার কাছে দিন ও রাতের পার্থক্য ঘুচে গেছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের সকাল আর নতুন মনে হয় না, মনে হয় গত রাতেরই অংশ। আমি শুধু মা–বাবার খবরের অপেক্ষায় থাকি। কারণ, জানি না কী হতে চলেছে।
এই অনিশ্চয়তা তাদের সব সময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ড্যানিয়েল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি সবকিছু থামিয়ে দিয়েছি...সারাক্ষণ ফোনে ইরানে কল করার চেষ্টা করি। আমার কাজ খুব খারাপ যাচ্ছে। ঘুমানোর সময় আমি খুব বাজে স্বপ্ন দেখি। আসলে সবকিছুই খুব খারাপ।’
মায়া বা ড্যানিয়েল কেউই জানেন না সামনে কী আছে। সরকার পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ থেকে যাবে।
মায়ার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি প্রচণ্ড জ্বরের মতো। তিনি বলেন, ‘যখন আপনার খুব জ্বর থাকে, শরীর কাজ করে না। বিপ্লবও তেমনি একধরনের জ্বর, যা সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শেষ পর্যন্ত যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী বা নিষ্ঠুর, সে–ই টিকে থাকে।’ সূত্র: আল-জাজিরা, যুক্তরাজ্য
নিজস্ব ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া আনছে ইরান
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা কত, জানালেন ইরানি কর্মকর্তা
খামেনির ওপর হামলা মানেই যুদ্ধ ঘোষণা: ইরান
