যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা অভিমুখী ফ্লোটিলা জাহাজ বহর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া মানবাধিকার কর্মীদের চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রেখে উপহাস করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়েছেন ইসরায়েলের অতি-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। এর জের ধরে ফরাসি সরকার তাদের দেশে বেন-গভিরের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
শনিবার (২৩ মে) ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ঘোষণা দেন, আজ থেকে ইতামার বেন-গভিরের ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলো। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'র যাত্রী হওয়া ফরাসি এবং ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রতি তাঁর নিন্দনীয় আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধত বেন-গভির নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন, যেখানে দেখা যায় আশদোদ বন্দরে ফ্লোটিলার সক্রিয়কর্মীদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং তিনি তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্য করছেন। চলতি সপ্তাহে সাইপ্রাস উপকূলের আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে ইসরায়েলি নৌবাহিনী ফ্লোটিলার জাহাজগুলো অবরুদ্ধ করে অবৈধভাবে প্রায় ৪৩০ জন আরোহীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার শত শত বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বন্দিদের মেঝে দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার এই অমানবিক দৃশ্য দেখে ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, কানাডা এবং স্পেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ নিজ নিজ দেশে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করে এই "অগ্রহণযোগ্য" আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানায়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, আমাদের ফরাসি নাগরিকরা এভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তার দ্বারা হুমকিস্বরূপ, অপমানজনক বা সহিংস আচরণের শিকার হবেন—তা আমরা কোনোভাবেই সহ্য করব না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বেন-গভিরের এই হীন আচরণের নিন্দা খোদ ইসরায়েলি সরকারের বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়ানোর যে ধারাবাহিকতা বেন-গভির বজায় রেখেছেন, এটি তারই অংশ। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো তিনিও পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বেন-গভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান।
'গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা'র আয়োজকরা গত শুক্রবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইসরায়েলের হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়া সক্রিয়কর্মীরা জানিয়েছেন যে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁদের ওপর অন্তত ১৫টি চরম যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।
আয়োজক গোষ্ঠীটির দাবি, এই যৌন নির্যাতনের মধ্যে ছিল—পোশাক খুলে অপমানজনক তল্লাশি, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ উপহাস, যৌনাঙ্গ চেপে ধরা এবং একাধিক ধর্ষণের ঘটনা। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে একটি জাহাজকে অস্থায়ী কারাগার বানিয়ে সেটির ভেতর। বিবৃতিতে বলা হয়, কেবল ওই একটি জাহাজেই অন্তত ১২টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে পায়ুপথে ধর্ষণ এবং হ্যান্ডগান বা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের (ধর্ষণের) ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক গত শুক্রবার এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'এই প্রতিবেদনগুলো আমাদের গভিরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে।' তবে ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত নির্যাতনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
কারাপ্রধানের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে দাবি করেছেন, উত্থাপিত এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
ফ্লোটিলা থেকে ৩৭ জন ফরাসি নাগরিককে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সহায়তাকারী সাবরিনা চারিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পাঁচজন ফরাসি নাগরিক বর্তমানে তুরস্কের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, যাদের কয়েকজনের পাঁজরের হাড় ও মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন ফরাসি নাগরিক তাঁদের ওপর হওয়া ধর্ষণসহ সুনির্দিষ্ট যৌন সহিংসতার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
গাজাগামী জাহাজগুলো থেকে সক্রিয়কর্মীদের ধরে নিয়ে ইসরায়েলে আটকে রাখার পর এমন অমানবিক আচরণের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে আয়োজকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং এই দমনপীড়নকে বৈধতা দিতে ইসরায়েল এখন ফ্লোটিলার সক্রিয়কর্মীদের সাথে হামাসের যোগসূত্র থাকার মতো মিথ্যা অজুহাত ও অপবাদ তৈরি করতে পারে। সূত্র: আল জাজিরা
ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’, বাকি শুধু আনুষ্ঠানিকতা: ট্রাম্প