বন উজাড়ের ক্ষত ঢাকতে রোপওয়ে : প্রয়োজন বিকল্প খাদ্য সংস্থান

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
টাঙ্গাইলে বন্যপ্রাণীর পারাপারে নির্মিত রোপওয়ে সত্যিকার অর্থে কোন কাজেই আসছে না।এক সময় বনের ভেতরে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছপালায় ভরপুর ছিল। ওই সব গাছের ফলমূল খেয়ে বন্যপ্রাণীরা তাদের ক্ষুধা নিবারণ করত। কালের আবর্তে বন বিভাগের অসাধু কর্তা ব্যক্তি ও বন খেকোদের যোগসাজসে গভীর অরণ্যের সেসব গাছপালা এখন বিলুপ্তির পথে। 
এ কারণে খাদ্যের সন্ধানে বন্য প্রাণীরা বেরিয়ে আসে পথচারীদের খোঁজে। প্রাণীবান্ধব কিছু মানুষ নিয়মিত এসব প্রাণীদের কিছু না কিছু খাবার দিয়ে থাকে। এ সময় খাবারের সন্ধানে এসে রাস্তা পারাপার হতে গিয়ে অনেক প্রাণী দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। 
 
বন্যপ্রাণীদের বিকল্প খাদ্য সংস্থানের জন্য বন বিভাগের নেই কোন বাস্তবমূখী পরিকল্পনা। বন্যপ্রাণীর মৃত্যুহার কমাতে বন বিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে মহাসড়কের ৮ কিলোমিটার সড়কে পাঁচটি রোপওয়ে স্থাপন করেছে। তবে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭৬ একর। এর মধ্যে মধুপুরের প্রাকৃতিক শাল-গজারি বন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, যা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা যায়, চলতি মাসের শুরুতে বন বিভাগের উদ্যোগে শালবন পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কের ওপর প্রায় ১০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থের লাইনারের সুতোর তৈরি পাঁচটি রোপওয়ে স্থাপন করা হয়। এর উদ্দেশ্য, গাছবাসী প্রাণীরা যেন সড়ক অতিক্রমের সময় রোপওয়ে ব্যবহার করে নিরাপদে এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বনের প্রাকৃতিক খাদ্যের সংকটের কারণে বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী খাদ্যের সন্ধানে মহাসড়কের পাশে চলে আসে। ফলে শুধু রোপওয়ে নির্মাণ করলেই প্রাণীর মৃত্যু কমবে না। আগে বনের খাদ্য সংকট দূর করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্থানীয় হাবিব সরকার বলছেন, বনবিভাগ সাম্প্রতি সময়ে যে রোপওয়ে করেছে সে বিষয়ে বলতে গেলে আগে চলে আসে বনের বানরদের খাবারের কথা। যেখানে বানর খাদ্যের সন্ধানে রাস্তার দুপাশে বসে থাকে।তারা তো আর মানুষের মত খাবার খেয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে পারাপার হবে এমন অভ্যস্ত না। 
 
 স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম জানান বনের ভিতর প্রকৃতির গাছ পালায় যখন খাদ্য থাকবে তখন এমনিতেই এসব  বানর লোকালয়ে প্রবেশ করবে না।এখন তো তারা লোকালয়ে খাদ্যের সন্ধানে বের হচ্ছে।  গাছপালায় খাবার থাকলে বানর গাছপালা দিয়েই দৌড়াদৌড়ি করবে। আর এমনিতেই তখন  উপর দিয়ে পারাপার হবে।
রূপালি নকরেকের ভাষ্য, বানরের যখন খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়ে গেছে খাদ্যের সন্ধানে তারা রাস্তায় নেমে গেছে। রাস্তায় খাবার খেয়ে রোপওয়ের উপর দিয়ে ঘুরে যাবে এটা অবুঝ বন্যপ্রাণী বুঝবে না।  
 
স্থানীয় লিটনের দাবি, কেবল রোপওয়ে নির্মাণ নয়, প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ, খাদ্যের উৎস বৃদ্ধি এবং বন দখল ও উজাড় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিলেই বন্যপ্রাণী রক্ষা করা সম্ভব হবে।
 
লালমিয়া মেম্বার জানান, প্রতিনিয়ত টাঙ্গাইল ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের দুপাশে  ঝাকে ঝাকে বন্যপ্রাণী খাবারের সন্ধানে বসে থাকে পথচারীরা কখন খাবার দিবে সেই অপেক্ষায়। প্রতিদিন বেশ কিছু পথচারীরাও নিয়মিত খাবার দিচ্ছে। কিছু কিছু পথচারী আছে তারা নিয়মিত যাতায়াত করেন এই মহাসড়ক দিয়ে। তারা আসা যাওয়ার সময় বানরদের জন্য আলাদা খাবার নিয়ে আসেন। তিনি মনে করেন রোপওয়ে  কোন কাজেই আসবে না। বানর তো আর মানুষের মত না যে এটি কিসের জন্য তৈরি করা হয়েছে তা তারা বুঝবে ।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি করছি রোপওয়ের পিছনে টাকা খরচ না করে বনের ভিতর বন্যপ্রাণীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা।
 
একদিকে গাছ কেটে বন উজার করছে। সেক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বন ছোট হয়ে আসছে। অপরদিকে বানরের জন্য রোপওয়ে  তৈরি করছে। আগে বন রক্ষা করুন দেখবেন এমনিতেই বন্যপ্রাণী লোকালয় প্রবেশ করছে না।
 
পরিবেশ সচেতন মহলের দাবি, শালবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক আবাস ও খাদ্যের উৎস হারাচ্ছে। তাই টেকসই সমাধানের জন্য বন পুনরুদ্ধার, দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ এবং প্রাণীদের খাদ্যের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।
 
টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা রাব্বি রায়হান বলেছেন,রোপওয়ে স্থাপনের কার্যক্রমটি পরীক্ষামূলক। এটি কতটা কার্যকর হবে, তা পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
MCH
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত