বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা সংকট: নেপথ্যে ট্রাম্পের ‘খামখেয়ালি’ আচরণ?

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৮:২৮ এএম

বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। খোদ মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশের মতে, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কারণেই বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার ওপর থেকে মানুষের আস্থা কমছে। 

আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাম্পের এই অস্থির নীতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে সংকটের মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিজেকে ‘পাগল’ দাবি ট্রাম্পের: নেপথ্যে কৌশল নাকি খামখেয়ালিপনা?

ইরানি সংবাদমাধ্যম 'ফার্স নিউজ এজেন্সি'-র বরাতে 'পার্স টুডে' জানায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বহুবার বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিজেকে "পাগল" বলে উল্লেখ করেছেন এবং এ নিয়ে প্রকাশ্যেই গর্ববোধ করেছেন। ট্রাম্পের এই বিতর্কিত দাবির পেছনে রয়েছে দুটি ভিন্ন সময়ের চিত্র:

২০১৮ সালের উত্তর কোরিয়া সংকট: ২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলাকালীন এক নৈশভোজে ট্রাম্প নিজেকে "পাগল" বলে আখ্যা দেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণা: ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনী প্রচারণাতেও ট্রাম্পকে তার এই স্বভাবের পক্ষে সাফাই গাইতে দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মূলত তার এই "পাগলামির" (অপ্রত্যাশিত আচরণের) কারণেই তাকে সমীহ ও সম্মান করেন।

মিত্রদের মাঝে বাড়ছে অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি আচরণ বিশ্বনেতাদের কাছে তাকে একটি অস্থিতিশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন এবং যেকোনো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত থেকে হুট করে পিছু হটার কারণে বিশ্বমঞ্চে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানিতে।

মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এখন বুঝতে হিমশিম খাচ্ছেন যে, তার ঠিক কোন বক্তব্য বা পদক্ষেপের ওপর ভরসা করা যায়।

পারমাণবিক চুক্তি ও ইরান প্রসঙ্গ

একটি বড় উদাহরণ হলো ইরান নীতি। ইরানের সঙ্গে নানা সময়ে আলোচনার মাঝেই ট্রাম্প প্রশাসন দুইবার সামরিক হামলা চালায়। এই আকস্মিক ও আক্রমণাত্মক নীতির কারণে শুধু ইরানই নয়, মার্কিন মিত্র দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এর আগে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার জন্য ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোর সামরিক সহায়তা চাইলেও, মার্কিন নীতির প্রতি অবিশ্বস্থার কারণে কোনো দেশই তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

মার্কিন যুদ্ধে অংশ নিতে অপরাগ ইউরোপ

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘অবিশ্বস্ত’ ভাবমূর্তির কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাচ্ছে না তার পশ্চিমা মিত্ররা। অনেক ইউরোপীয় দেশ এরই মধ্যে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— "এই যুদ্ধ তাদের নয়।" বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ট্রাম্পের যে আচরণকে "অপ্রত্যাশিত বা চমকপ্রদ" বলা হতো, তা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থায়ী "অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা"-তে রূপ নিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে সমন্বয়হীনতা ও বৈশ্বিক উদ্বেগ

‘দ্য আটলান্টিক’-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক কর্মকর্তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। একই সাথে মার্কিন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বক্তব্যের মধ্যে বিশাল অমিল ও সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। হোয়াইট হাউজের প্রাতিষ্ঠানিক বার্তার সাথে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ট্রুইট বা পোস্টের এই বৈপরীত্য বিশ্বরাজনীতিতে সুপারপাওয়ার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দিন দিন আরও দুর্বল করে তুলছে।

আরও পড়ুন