ইউক্রেনের ওপর হামলায় নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে রাশিয়া। দ্রুতগতির এসব ড্রোন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলায় নিহত হয়েছেন ডজন ডজন মানুষ, আর রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলাতেও বারবার বিমান হামলার সতর্কতা জারি করতে হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ‘শাহেদ’ শ্রেণির জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। নতুন প্রজন্মের এসব ড্রোন আগের প্রপেলারচালিত মডেলের তুলনায় অনেক দ্রুতগতির। ফলে ইউক্রেনের প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এগুলো শনাক্ত ও ভূপাতিত করতে তুলনামূলক বেশি সমস্যায় পড়ছে।
সাম্প্রতিক হামলার সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২৯ আগস্ট কিয়েভের পশ্চিমে মাইলা গ্রামে। সেখানে একটি রুশ জেটচালিত ‘গেরান-৪’ ড্রোন একটি গোলাবারুদ গুদামে আঘাত করলে ব্যাপক বিস্ফোরণ শুরু হয়। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার হিসাবে, ওই ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হন। ওয়াশিংটন পোস্ট ঘটনাটিকে চলতি বছরে ইউক্রেনে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ২১ জন আহত হন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহানাত জানান, মাত্র ছয় দিনে রাশিয়া প্রায় ২ হাজার ৮০০ জেটচালিত ড্রোন ছুড়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে।
নতুন ড্রোনগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো গতি। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেটচালিত ড্রোন ঘণ্টায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মাইল গতিতে উড়তে পারে—যা আগের প্রপেলারচালিত ড্রোনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এগুলো তুলনামূলক বেশি উচ্চতায়ও উড়তে পারে। ফলে পুরোনো ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থা দিয়ে এগুলো ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষায় নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক ধীরগতির ড্রোন মোকাবিলায় মোবাইল ফায়ারিং ইউনিট, বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য ব্যবস্থা ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু দ্রুতগতির নতুন ড্রোনের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত কম খরচের কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সতর্ক করেছেন, রাশিয়া ক্রমাগত বড় আকারে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে একটি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও সবগুলোকে ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু প্রাণহানিই নয়, এসব হামলার কারণে ইউক্রেনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কিয়েভে এখন রাতের পাশাপাশি দিনের বেলাতেও বিমান হামলার সতর্কতা জারি হচ্ছে। স্কুল, অফিস, গণপরিবহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বারবার থেমে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা চলায় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্লান্তি ও মানসিক চাপও বাড়ছে।
রাশিয়ার এই নতুন কৌশল মূলত বিপুলসংখ্যক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অভিভূত’ করার দিকে যাচ্ছে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। কম খরচের ড্রোন দিয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করাতে বাধ্য করা হলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মজুতের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
ইউক্রেন অবশ্য নতুন হুমকি মোকাবিলায় দ্রুতগতির ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির দিকে এগোচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি কম খরচের ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা বাড়ানোই এই নতুন হুমকি মোকাবিলার কার্যকর উপায় হতে পারে।
এদিকে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও সামনে এসেছে। তবে মাঠে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় ইউক্রেনের শহরগুলোতে নতুন ধরনের ড্রোন হামলার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
ফলে রাশিয়ার জেটচালিত ড্রোনের আবির্ভাব ইউক্রেন যুদ্ধের আকাশযুদ্ধের চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। দ্রুতগতির এসব অস্ত্র শুধু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে না, বরং ইউক্রেনের বেসামরিক জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রায় তিন বছর পর ফিরলো ফিলিস্তিনি ফুটবল
ইরান যুদ্ধের তথ্য ফাঁস: মিথ্যা শনাক্তকারী পরীক্ষার মুখোমুখি ৫০ কর্মকর্তা
বিশ্ব মানচিত্রে বড় হচ্ছে আফ্রিকা, জাতিসংঘে প্রস্তাব পাস