হুথি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর সংঘাত

ইয়েমেনে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০ পিএম

ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম (IOM) জানিয়েছে, সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার পর দেশটির তাইজ ও আল-হুদাইদাহ প্রদেশে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

আইওএম ইয়েমেনের প্রধান মিশন কর্মকর্তা আবদুসাত্তোর এসোয়েভ এডেন থেকে সাংবাদিকদের বলেন, দেশটির পশ্চিম উপকূলে সহিংসতা দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ‘ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে’। জাতিসংঘের সংস্থাটি জানিয়েছে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ বিভিন্ন বাস্তুচ্যুতি শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। অনেক পরিবার কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।

আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সংঘাত দ্রুত তীব্র হওয়ার পর মাত্র ৭২ ঘণ্টায় প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাইজ ও আল-হুদাইদাহ প্রদেশের বিভিন্ন এলাকা। আইওএমের হিসাবে, বাস্তুচ্যুতদের অনেকেই আগে থেকেই যুদ্ধের কারণে একাধিকবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এসোয়েভ বলেন, অনেক পরিবার এরই মধ্যে একবার, দুবার এমনকি চারবার পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় এসব পরিবারের সামনে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

গত কয়েক দিনে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত বৃহস্পতিবার থেকে ৩০০ জনের বেশি নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে কম সংঘাতের মধ্যে ছিল ইয়েমেন। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াই নতুন করে দেশটিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

তাইজ ও লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় সংঘাতের তীব্রতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে ইয়েমেনের সংকটের প্রভাব আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাণিজ্যেও পড়তে পারে।

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে ইয়েমেনের স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অবকাঠামো ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন করে হাজার হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতি দেশটির আগে থেকেই ভয়াবহ মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের জন্য নতুন করে আশ্রয় ও জীবিকা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে অনেক এলাকায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ৭৩ জন আহত এবং কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। এতে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনে যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষের হিসাব নয়; এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। একের পর এক হামলা ও সংঘর্ষের মধ্যে পরিবারগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাড়িঘর ছাড়ছে।

আইওএমের সতর্কবার্তা- ‘বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে’ ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অবস্থান বদলালেও সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা এখনো অনিশ্চিত। আর সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতে পারে আরও হাজার হাজার পরিবার।

জেএম
আরও পড়ুন