জার্মানির উত্তরাঞ্চলীয় শান্ত ল্যাগুন 'গ্রেফ্সভাল্ড উপসাগরে' সমুদ্রের তলদেশে পাইপলাইন বসানোর কাজ শুরু করার আগে সাধারণ তল্লাশি চালাতে নেমেছিলেন ডুবুরিরা। কিন্তু পানির তলদেশের ঘোলা ও অনিশ্চিত পরিবেশে নেমে তারা এমন কিছুর মুখোমুখি হন যা কেউ কল্পনাও করেনি—পুরোনো জুতোর তলা, কাঠের কপিকল (পুলি ব্লক) এবং একটি মরচে ধরা ভারি নোঙর।
পরবর্তীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, এটি আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের একটি অজানা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। সম্প্রতি 'ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নটিক্যাল আর্কিওলজি'-তে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এই তাড়াহুড়ো করে চালানো ঐতিহাসিক উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
পাইপলাইন তৈরির উদ্দেশ্যে ড্রেজিং (খননকাজ) কাজ শুরু হওয়া একদম বাধ্যবাধকতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে বিন্দুমাত্র সময় ছিল না। ওয়ানশ বিশ্ববিদ্যালয় (University of Warsaw)-এর পানির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক মিচেল গ্রাবোস্কি (Michał Grabowski) ছবি দেখে বুঝতে পারেন এগুলো কোনো ডুবে যাওয়া জাহাজের অংশ।
এরপর ৫ জনের একটি বিশেষজ্ঞ দল মাত্র ১২ দিনে ২২টি ডুব দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে যত দ্রুত সম্ভব জিনিসপত্র তুলে আনার কাজ শুরু করেন। তবে কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। পানির প্রায় ২৫ ফুট (৭.৫ মিটার) গভীরে পলিমাটি ও কাদার কারণে ডুবুরিদের সামান্য নড়াচড়াতেই চারপাশের পানি ঘোলা হয়ে যেত। উদ্ধার করা জিনিসপত্র সমুদ্রের ট্রলারে তুলে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে সাময়িকভাবে পানির ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়।

উদ্ধার হওয়া জাহাজের কাঠামোর মূল বডি বা হালের খুব সামান্য অংশই টিকে ছিল। সেখানে ছিল মাত্র ২৪ ফুটের মতো একটি বাইরের কাঠের তক্তা এবং চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কঙ্কালসদৃশ কাঠের ফ্রেম। টিনের চালের মতো একটি কাঠ অন্য কাঠের ওপর উঠিয়ে লোহা দিয়ে পেরেক মেরে তৈরি এই বিশেষ জাহাজ নির্মাণ পদ্ধতিকে 'ক্লিঙ্কার টেকনিক' বলা হতো। জোড়া লাগানো স্থানে আলকাতরা ও পশুর পশম দিয়ে পানি আটকানোর ব্যবস্থা ছিল।
গাছের বলয় বা 'ট্রি-রিং' পরীক্ষা করে গবেষকরা জানান, জাহাজটি তৈরিতে ব্যবহৃত অন্তত একটি গাছ ১৬২৬ থেকে ১৬৩৯ সালের মধ্যে কাটা হয়েছিল। অর্থাৎ এটি সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকের জাহাজ।
অভিযানকালে প্রত্নতাত্ত্বিকরা জাহাজের ভেতরে ব্যবহৃত ৬০টিরও বেশি মূল্যবান প্রত্নবস্তু উদ্ধার করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে কাঠের পাম্প হিসেবে ব্যবহৃত একটি ফাঁপা ওক গাছের গুঁড়ি, দড়ি, ব্যারেলের ফ্রেম এবং কাঠমিস্ত্রির হরেক রকমের যন্ত্রপাতি। যেমন ড্রিল বা ছিদ্র করার যন্ত্রের হাতল (যা বিখ্যাত ইংরেজ যুদ্ধজাহাজ 'মেরি রোজ'-এ পাওয়া যন্ত্রের মতো)। এতে ধারণা করা হয়, দীর্ঘ যাত্রায় জাহাজ মেরামত করার জন্য এতে একটি ভ্রাম্যমাণ ওয়ার্কশপ বা মিস্ত্রিখানা ছিল।
নাবিকদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের খুব কম জিনিসপত্রই মেলে—কেবল দুটি জুতোর তলা ও চামড়ার বেল্ট। এ ছাড়া হাড়ের অবশিষ্টাংশ থেকে বোঝা যায় নাবিকরা সেখানে শুয়োর, ভেড়া বা ছাগলের মাংস খেতেন।
তবে গবেষকদের সবচেয়ে বেশি ধন্দে ফেলেছে বিশেষ একটি জিনিস—একটি ফ্ল্যাট কাদামাটির ইট, যার মধ্যে কতগুলো ছোট ছোট ছিদ্র রয়েছে এবং সেটি একখণ্ড ওক কাঠের ভেতর আটকানো। ইতিহাসে এমন জিনিসের ব্যবহার আর দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, বাটালি বা ড্রিলের মতো মেটালের ভোঁতা যন্ত্রপাতি ধারালো করতে এই ইটটি বানিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

জাহাজটির কিছু কাঠে পোড়া দাগ পাওয়া গেছে, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে হয়তো কোনো এক অগ্নিকাণ্ডে জাহাজটির সলিল সমাধি হয়েছিল। এ ছাড়া দুটি নোঙর এবং বিশেষ ভাসমান বয়া দেখে মনে হয়, ডুবে যাওয়ার সময় জাহাজটি হয়তো নোঙর করা অবস্থায় ছিল।
তবে গবেষক গ্রাবোস্কি অতিরিক্ত কোনো কল্পনা বা অনুমান করতে নারাজ। তিনি বলেন, "আমি কাল্পনিক কিছু বলতে চাই না, এতে বিকল্প ইতিহাস তৈরি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।"
পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় জাহাজটির আসল নাম, এটি কোনো দেশের ছিল বা কোথায় যাচ্ছিল তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পাওয়া জায়গার পূর্ব দিকে হয়তো আরও বড় কোনো অংশ লুকিয়ে আছে, যা এখনো খোঁজা হয়নি।
বর্তমানে অফশোর গ্যাস, তেল ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি প্রকল্পের কাজ বাড়ায় গ্রেফ্সভাল্ড উপসাগরে প্রায়ই এমন প্রাচীন জাহাজের সন্ধান মিলছে, যা এককালে ইউরোপের ওডার নদী এবং বাল্টিক সাগরের মধ্যে অন্যতম প্রধান বাণিজ্যের পথ ছিল।
এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষটি ধ্বংস না করে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত মূল পাইপলাইনের দিক বা পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। আর উদ্ধার অভিযান শেষে জাহাজের অবশিষ্টাংশ আবার বালির বস্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যাতে এটি আগামী দিনেও পানির নিচে নিরাপদ 'টাইম ক্যাপসুল' হিসেবে সুরক্ষিত থাকে।